প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কিশোরগঞ্জ আগমন উপলক্ষে কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে জমে থাকা প্রায় ২০ বছরের পুরোনো বিশালাকার একটি ময়লার ভাগাড় অবশেষে বালুচাপা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এই তাৎক্ষণিক উদ্যোগের পাশাপাশি জেলা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাটের আশপাশে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য সরানোর বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে স্থানীয় পৌরসভা কর্তৃপক্ষ।
শনিবার (১৫ আগস্ট) কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের খিলপাড়া এলাকায় গিয়ে সরেজমিনে প্রশাসনিক তৎপরতার এমন চিত্র প্রত্যক্ষ করা গেছে। ওই এলাকার জেলা সদরের খিলপাড়া অংশে মহাসড়কের পাশে প্রায় এক কিলোমিটারের এক দীর্ঘ এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা বিশাল ময়লার স্তূপের ওপর ভারী বালু ফেলে ঢেকে দেওয়া হয়।
ঘটনাস্থল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মহাসড়কের একদম পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা আগের সেই বিশাল ময়লার স্তূপটি এখন আর চোখে পড়ছে না। বিগত দিনগুলোতে যেখানে পথচারী, সাধারণ মানুষ ও যানবাহনের যাত্রীরা মহাসড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় পচা ময়লা-আবর্জনার তীব্র ও অসহনীয় গন্ধ থেকে বাঁচতে নাকে রুমাল চাপা কিংবা নাক চেপে ধরে চলাচল করতে বাধ্য হতেন, সেখানে বর্তমানে বালুচাপা দেওয়ার ফলে দুর্গন্ধ অনেকাংশেই কমে গেছে এবং সবাই বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ জেলার আওতাধীন খিলপাড়া এলাকার কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে সুবিশাল এক কিলোমিটার এলাকা দখল করে প্রায় দীর্ঘ ২০ বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভিন্ন ধরনের শহর ও গ্রামীণ ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছিল। কিশোরগঞ্জ শহরের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কাঁচাবাজার, দোকানপাট ও হাজার হাজার বাসাবাড়ির বর্জ্যের পাশাপাশি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্য নিয়মিতভাবে এই খোলা জায়গায় এনে ফেলা হতো। শুধু জেলা শহরই নয়, কিশোরগঞ্জ পৌরসভার বর্জ্যের সাথে কটিয়াদী, পাকুন্দিয়া ও হোসেনপুর উপজেলার কিছু অংশের ময়লা-আবর্জনাও এই নির্দিষ্ট স্থানে এনে স্তূপ করা হতো। এসব ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক বর্জ্য বছরের পর বছর উন্মুক্তভাবে মহাসড়কের পাশে পড়ে থাকার ফলে তৈরি হতো তীব্র দুর্গন্ধ, যা এলাকাবাসী ও পথচারীদের জন্য সৃষ্টি করত এক চরম নরকযন্ত্রণা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি।
উল্লেখ্য যে, কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথ। এই পথটি দিয়ে প্রতিদিন দেশের প্রধান প্রধান শহর ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট এবং ভৈরবগামী হাজার হাজার যাত্রীবাহী যানবাহন, পণ্যবাহী ট্রাক ও অগণিত পথচারী যাতায়াত করে থাকেন। বিশেষ করে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিতে পচে যাওয়া ময়লা গলে গিয়ে সরাসরি পিচঢালা মূল সড়কে চলে আসায় যাতায়াতকারীদের ভোগান্তি ও দুর্ভোগ আরও বহুগুণ বেড়ে যেত। স্থানীয়রা জানান, প্রায় তিন থেকে চার বছর আগে এই এলাকায় বর্জ্য সুনির্দিষ্টভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে প্রায় ১০ কোটি টাকা বিপুল ব্যয়ে একটি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প তৈরি করা হয়েছিল। তবে দুঃখজনকভাবে দীর্ঘ সময় পার হলেও কেবল প্রয়োজনীয় লোকবল সংকটের অজুহাতে সেই মূল্যবান প্রকল্পটি আজও চালু করা সম্ভব হয়নি।
এলাকার স্থানীয় ভুক্তভোগী লোকজন ক্ষোভের সাথে জানান, গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের পাশ থেকে এই দীর্ঘদিনের মারাত্মক ময়লার ভাগাড় স্থায়ীভাবে অপসারণ ও স্থানান্তরের দাবিতে তারা প্রশাসনের কাছে বছরের পর বছর ধরে জোর দাবি জানিয়ে আসছেন। বর্জ্য অপসারণের জন্য তারা মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা ধরনের সামাজিক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করলেও এতদিন পৌরসভার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর এই বহুল প্রতীক্ষিত আগমন উপলক্ষে গত এক সপ্তাহ ধরে তড়িঘড়ি করে ময়লার কিছু অংশ সরিয়ে নেওয়ার পর বাকি পুরো এলাকায় ভারী বালুচাপা দিয়ে দৃশ্যটি ঢেকে দেওয়া হয়েছে। একই মহাসড়কের কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড এলাকাতেও দীর্ঘদিন ধরে জমা হওয়া আরেকটি ময়লার স্তূপ ছিল। প্রধানমন্ত্রীর সফরের কারণে সেখানেও একইভাবে বালুচাপা দিয়ে ময়লার সেই পাহাড় ঢেকে দেওয়ার কাজ চলছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের স্পষ্ট ভাষ্য, মূলত প্রধানমন্ত্রীর নজর এড়াতে ও পরিদর্শনকালে শহরের ভাবমূর্তি রক্ষা করতেই তড়িঘড়ি করে সাময়িক এই লোকদেখানো বালুচাপা দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভয়, প্রধানমন্ত্রী সফর শেষ করে ঢাকা ফিরে গেলেই পরিবেশ আবার আগের সেই দুর্গন্ধময় ও বিপজ্জনক রূপেই ফিরে আসবে।
খিলপাড়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সড়কের পাশ থেকে এই বিষাক্ত ময়লা সরানোর জন্য আমরা পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিক আবেদন জানিয়েছি, কিন্তু তারা কখনও কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অথচ এখন প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে ঠিকই রাতারাতি বালুচাপা দিয়ে সব ময়লা ঢেকে ফেলা হচ্ছে। এতেই পরিষ্কার প্রমাণিত হয় যে কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা ও সদিচ্ছা থাকলে তারা যেকোনো সময় এই জনদুর্ভোগ খুব সহজেই লাঘব করতে পারে। তবে আমরা শুনেছি এটি কেবল অস্থায়ীভাবে করা হয়েছে। আমরা চাই সাময়িক বালুচাপা না দিয়ে স্থায়ীভাবে এই বিষাক্ত বর্জ্যের সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান করা হোক।’
এই বিষয়ে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক এবং স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরের কিশোরগঞ্জ জেলার উপপরিচালক জেবুন নাহার শাম্মী প্রশাসনের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে শহরের সর্বত্র যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা না ফেলে সার্বিকভাবে পুরো শহর ও তার আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য পৌরসভার পক্ষ থেকে পুরো শহরে মাইকিং চালিয়ে সাধারণ জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে, যাতে কেউ আগামী কয়েক দিন যত্রতত্র রাস্তায় বা খোলা উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য না ফেলেন। তারই ধারাবাহিকতায় কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে ময়লা ফেলার জায়গাটি সাময়িকভাবে বালুচাপা দিয়ে সুন্দর করে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। তবে আমরা এই স্থানে স্থায়ীভাবে বর্জ্য নিরসনের জন্য একটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছি, যা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।’
এদিকে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে জারি করা এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী রোববার কিশোরগঞ্জ জেলায় এক গুরুত্বপূর্ণ সফরে আসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় মৎস্য পক্ষ উদযাপন উপলক্ষে তিনি কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলায় সকাল সাড়ে ১১টার দিকে জলাশয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করবেন। এরপর তিনি কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
বিকেল ৪টার দিকে প্রধানমন্ত্রী জেলা শহরের পুরাতন স্টেডিয়াম মাঠে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, বিভিন্ন অনুদান প্রদান এবং সম্মানী প্রদান কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করবেন। দিনব্যাপী একাধিক কর্মসূচীতে অংশ নেওয়া শেষে একই দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিনি ঢাকার উদ্দেশে পুনরায় কিশোরগঞ্জ ত্যাগ করবেন।
আকাশজমিন / আরআর