ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬,  ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
আরও এক বছরের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব থাকছেন ড. নাসিমুল গনি ইরাকি কুর্দিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জোড়া ড্রোন হামলা লোহিত সাগরে সৌদির যুদ্ধজাহাজে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে বেলজিয়াম হরমুজ প্রণালি আমাদের নিয়ন্ত্রণে, ওমান বাধা দিলে হামলা: ট্রাম্প খায়রুল হকের কারামুক্তিতে বাধা নেই, আদালতের অনুমতি ছাড়া দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেশজুড়ে বোমা উদ্ধার ও জাতিসংঘের উদ্বেগে জঙ্গিবাদ নিয়ে নতুন তোলপাড় গভীর রাতের মধ্যে ১৫ অঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টির শঙ্কা সংবিধান লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহার: ড. ইউনূসের সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে মৃত্যুদণ্ড সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যঙ্গাত্মক 'ককরোচ আন্দোলন' থেকে ভারতীয় রাজনীতিতে তোলপাড়

দেশজুড়ে বোমা উদ্ধার ও জাতিসংঘের উদ্বেগে জঙ্গিবাদ নিয়ে নতুন তোলপাড়


  • আপলোড সময় : সোমবার ১৭ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৭:১১ পিএম

রাজধানী ঢাকা ও এর চারপাশের এলাকা থেকে একের পর এক বোমা, ককটেল এবং বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের খবর দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সম্প্রতি ঢাকার সাভারে নিষিদ্ধঘোষিত ‘নব্য জেএমবি’র সম্ভাব্য একটি বোমা তৈরির কারখানার সন্ধান মেলে, যেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান নামের এক যুবককে। ঠিক এমনই এক স্পর্শকাতর সময়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল-কায়েদার গোপন সেল গঠন ও কার্যক্রম নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। জোড়া এই ঘটনা দেশে জঙ্গিবাদ ও সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা ও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, দেশে বড় ধরনের কোনো জঙ্গি তৎপরতা বা নাশকতার হুমকি নেই। আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি উল্লেখ করে তাদের দাবি, যেকোনো দেশবিরোধী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই বলে সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, জাতিসংঘের বার্তাকে কেবল ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ আখ্যা দিয়ে উড়িয়ে না দিয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে উগ্রবাদীদের ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, তা-ও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার তাগিদ দিয়েছেন তারা।


জাতিসংঘের ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদার শাখা একিউআইএস (AQIS) এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট সেলের মাধ্যমে লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সংগঠনটি বাংলাদেশে নিজেদের গোপন সেল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। গত বছরের নভেম্বরে দিল্লির লাল কেল্লায় হামলার ঘটনার কথা উল্লেখ করে এই আঞ্চলিক হুমকি বিস্তারের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, আল-কায়েদার শীর্ষ নেতৃত্ব আফগানিস্তানের কাবুলে অবস্থান করছে এবং তাদের বিশেষ তালেবানি পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে।


জাতিসংঘের এই আন্তর্জাতিক বার্তা আসার আগেই দেশের অভ্যন্তরে ধারাবাহিকভাবে বোমা উদ্ধারের খবর আসতে থাকে। ডেমরার সানারপাড়ায় একটি বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় দুটি বোমাসদৃশ বস্তু, যা সিটিটিসির বোম ডিসপোজাল ইউনিট নিষ্ক্রিয় করে। এতে গ্রেপ্তার হওয়া ‘ওস্তাদ জুয়েল’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তির সাংগঠনিক পরিচয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এর আগে সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরে এক অভিযানে নব্য জেএমবিতে যোগ দেওয়া আরিফকে ৯টি বিস্ফোরক ও বিপুল পরিমাণ গানপাউডারের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়। সিটিটিসি পুলিশ জানায়, ইমরানের গুরু ও পরিচিত বোমা বিশেষজ্ঞ নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’কে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এ ছাড়া আশুলিয়া ও মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল তৈরি করা বোমা।


সাম্প্রতিক সময়ে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়নে সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে তথ্যের সুনির্দিষ্ট ঘাটতি থাকতে পারে, তবে একে অমূলক ভেবে চুপ করে থাকার সুযোগ নেই। উগ্রবাদবিরোধী কার্যক্রমে ধারাবাহিক নজরদারি বজায় না রাখায় সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি পুলিশের বিশেষায়িত জঙ্গিবাদবিরোধী ইউনিটগুলোর সক্ষমতা ও আধুনিকীকরণ দ্রুত বৃদ্ধির পরামর্শ দেন। সাবেক এই আইজিপি স্পষ্ট করেন, কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী উগ্রবাদীদের নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার এবং দেশের প্রচলিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।


অন্যদিকে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, উগ্রবাদী তৎপরতার পেছনে ভৌগোলিক অবস্থানসহ দীর্ঘমেয়াদি কারণ রয়েছে। বাংলাদেশে আল-কায়েদার গোপন সেলের তথ্য কেবল জাতিসংঘের নয়, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের জন্য মারাত্মক উদ্বেগের বিষয়। অহেতুক তাড়াহুড়ো করে বা রাজনৈতিক কারণে ঢালাওভাবে কারো ওপর দোষ চাপিয়ে দিলে মূল অপরাধীরা আড়ালে পার পেয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া তদন্ত ছাড়া চললে অপরাধীরা একে 'পরীক্ষামূলক আত্মপ্রকাশ' হিসেবে ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো অঘটন ঘটাতে পারে।


উল্লেখ্য, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশজুড়ে ৬৩টি জেলায় একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। সেই ঘটনার পর বহু বছর ধরে উগ্রবাদবিরোধী অভিযান সচল থাকলেও সম্প্রতি দেশের পটপরিবর্তনের সুযোগে কারাগার থেকে সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন বেশ কয়েকজন জঙ্গি সদস্য জামিনে বা পলায়নসূত্রে বাইরে চলে আসে। ফলে বর্তমানের সার্বিক নিরাপত্তা শঙ্কা মোকাবিলায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং পুলিশ বাহিনীর বিশেষায়িত জঙ্গিবাদবিরোধী ইউনিটগুলোকে আরও বেশি কার্যকর করা জরুরি হয়ে পড়েছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর