বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ও স্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে থাকা দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ ম্যাচের বলটি আবারও বড় অঙ্কের অর্থে নিলামে বিক্রি হয়েছে। ১৯৮৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে ব্যবহৃত এই ঐতিহ্যবাহী বলটি সম্প্রতি বিপুল মূল্যে হাতবদল হয়ে ৩৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারে বিক্রি সম্পন্ন হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডালাসভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিখ্যাত নিলামকারী প্রতিষ্ঠান হেরিটেজ অকশন্সের সার্বিক পরিচালনায় বিশেষ এই নিলাম অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটির বলটি কেনার জন্য বিশ্বজুড়ে ক্রীড়া স্মারক সংগ্রাহকদের মধ্যে চরম প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়।
১৯৮৬ সালের সেই উত্তেজনাকর কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোল ব্যবধানে পরাজিত করে সেমিফাইনালে পা দিয়েছিল আর্জেন্টিনা। ঐতিহাসিক ওই খেলায় ব্যবহৃত হয়েছিল বিখ্যাত অ্যাডিডাস ব্র্যান্ডের বিশেষ ‘অ্যাজটেকা’ মডেলের বল। পুরো ফুটবল বিশ্বের নজর কাড়া সেই একই ম্যাচেই কিংবদন্তি মহাতারকা ম্যারাডোনা তাঁর জীবনের এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় ও আলোচিত দুটি গোল উপহার দিয়েছিলেন।
ম্যাচের প্রথমার্ধের পর বহুল আলোচিত প্রথম গোলটি পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’ নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রতিপক্ষ ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিল্টনের লাফিয়ে ওঠা মাথার ওপর দিয়ে বল জালে ঢুকিয়ে দিতে ম্যারাডোনা চতুরতার সাথে তাঁর বাঁ হাত ব্যবহার করেছিলেন। সেই সময় মাঠের ম্যাচ কর্মকর্তারা বিষয়টি অনুধাবন করতে না পেরে গোলটি সম্পূর্ণ বৈধ বলে ঘোষণা করেন।
সেই বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই ঐতিহাসিক সেই ঘটনার ঠিক চার মিনিট পর নিজের অর্ধাংশ থেকে একক প্রচেষ্টায় বল ড্রিবলিং করে একে একে পাঁচজন ইংলিশ ফুটবলার ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে অবিশ্বাস্য এক গোল করেন এই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। পরবর্তীতে ফিফার বিশ্বব্যাপী কোটি সমর্থকের ভোটে এই অনবদ্য দৃশ্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
নিলাম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান হেরিটেজ অকশন্স নিশ্চিত করেছে যে, ওই ঐতিহাসিক ম্যাচের খেলার চলাকালীন তোলা বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ফুটেজের সাথে সূক্ষ্মভাবে মিলিয়ে তাদের বিশেষজ্ঞ দল বলটির শতভাগ মৌলিক পরিচয় নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটি নিলামের পূর্বে বলটির আনুমানিক ন্যূনতম মূল্য অন্তত ১ কোটি ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে বলে ধারণা করেছিল। তবে সেই প্রত্যাশার তুলনায় ৩৩ লাখ ৫০ হাজার ডলারের চূড়ান্ত বিক্রিমূল্য কিছুটা কম বলেই মনে করছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকরা।
উলেখ্য, স্মরণীয় এই ম্যাচটির তিউনিসিয়ান রেফারি আলি বিন নাসের দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে এই ঐতিহাসিক বলটি নিজের ব্যক্তিগত সংগ্রহে সযত্নে রেখেছিলেন। এর আগে ২০২২ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত এক নিলামে তিনি বলটি ২০ লাখ পাউন্ড বা প্রায় ২৩ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলারে প্রথমবারের মতো বিক্রি করে দেন। এছাড়া একই ম্যাচে ম্যারাডোনার পরিহিত ঐতিহাসিক জার্সিটিও ২০২২ সালে বিখ্যাত সোথবির নিলামে রেকর্ড প্রায় ৯৩ লাখ মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক এই বিক্রয় মূল্যটি কোনো ক্রীড়া বলের ক্ষেত্রে বিশ্ব রেকর্ড গড়তে ব্যর্থ হয়েছে। চলতি সময়ের অন্য ক্রীড়া স্মারকের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৪ সালে মেজর লিগ বেসবলে শোহেই ওতানির ৫০তম হোম রান করার বলটি সর্বকালের রেকর্ড গড়ে ৪৩ লাখ ৯২ হাজার ডলারে বিক্রি হয়। অন্যদিকে সব ধরনের খেলাধুলার ইতিহাস মিলিয়ে সবচেয়ে ব্যয়বহুল স্মারকের রেকর্ডটি এখনো কিংবদন্তি বেবে রুথের জার্সির দখলে। ১৯৩২ সালের ওয়ার্ল্ড সিরিজে পরা নিউ ইয়র্ক ইয়াঙ্কিসের এই খেলোয়াড়ের ঐতিহাসিক জার্সিটি ২০২৪ সালে ২ কোটি ৪১ লাখ ২০ হাজার ডলারে নিলামে বিক্রি করে চমক সৃষ্টি করেছিল হেরিটেজ অকশন্স।