২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণদের নেতৃত্বে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে এনসিপিকে ঘিরে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকদের সঙ্গে দলটির নেতাদের ধারাবাহিক বৈঠক, মতবিনিময় ও যোগাযোগ সেই আগ্রহকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
দেশের বড় ও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি তুলনামূলক নতুন একটি দলকে বিদেশি কূটনীতিকদের এমন গুরুত্ব দেওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নও উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে গুরুত্ব এনসিপি পেয়েছিল, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও তার ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এনসিপির প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর আগ্রহ কি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তনের কারণে, নাকি এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনীতির হিসাবও জড়িত?
এনসিপির আন্তর্জাতিক সেলের ইনচার্জ আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ছাত্রনেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। সে সময় কোনো রাজনৈতিক দল সরকার পরিচালনায় না থাকায় সংস্কার ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিদেশিরা বিএনপি-জামায়াতের পাশাপাশি ছাত্রনেতৃত্বকেও গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হিসেবে দেখেছিলেন।
বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন উল্লেখ করে আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, এনসিপি এখন একটি সংসদীয় রাজনৈতিক দল এবং তরুণদের নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক শক্তি। তাই বিদেশিদের পক্ষ থেকে দলটিকে গুরুত্ব দেওয়া স্বাভাবিক। তাঁর মতে, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বিষয়গুলো এনসিপির রাজনৈতিক এজেন্ডায় থাকায় আন্তর্জাতিক মহলে দলটির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এনসিপির নেতাদের বৈঠক হয়েছে। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, নির্বাচন, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, রাষ্ট্র সংস্কার, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
গত ১২ আগস্ট এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের সেন্টার ফর ইনসাইটস ইন সার্ভে রিসার্চের সিনিয়র ডিরেক্টর সোনজা গ্লকলে নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল। এ সময় এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন তারা।
এর আগে ৬ আগস্ট এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম এবং মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারা কুক। ২২ জুলাই মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলও এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে।
এ ছাড়া স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ডেনমার্ক, নরওয়ে ও সুইডেনের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গেও এনসিপির নেতাদের পৃথক বৈঠক হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদল, এশিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রতিনিধিদল এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও এনসিপির নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার মনে করেন, নির্বাচনে দলটির ইতিবাচক ফলাফল এবং সংসদে অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ বেড়েছে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা নিয়মিত এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসছেন এবং দলটির রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
সারোয়ার তুষারের মতে, এনসিপি তরুণদের নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিবর্তনের রাজনীতি করছে। নতুন রাজনৈতিক চিন্তা, তরুণ নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা দলটির প্রতি বিদেশিদের আলাদা মনোযোগ তৈরির অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, বিদেশিরা এনসিপিকে কোনো জোটের সাধারণ অংশীদার হিসেবে নয়, বরং একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করছে।
এনসিপির যুগ্ম-সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশিরও মনে করেন, দলটির প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের গুরুত্ব বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এনসিপির নেতারা মূলত গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এখন তারা জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে তাদের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
জয়নাল আবেদীন শিশির বলেন, এনসিপির নেতৃত্ব তুলনামূলকভাবে তরুণ। নতুন রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা, রাষ্ট্র সংস্কারের এজেন্ডা এবং সংসদে দলটির প্রতিনিধিত্ব বিদেশিদের আগ্রহের অন্যতম কারণ। তাঁর মতে, জোটের অংশীদার হলেও এনসিপিকে শুধু জোটের একটি দল হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও নীতির কারণে দলটি আলাদাভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে।
তবে এনসিপির প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর এই আগ্রহ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নও রয়েছে। কেউ কেউ এর পেছনে বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা করছেন।
এনসিপির আন্তর্জাতিক সেলের ইনচার্জ আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিদেশি কূটনীতিকদের যোগাযোগ একটি স্বাভাবিক ও চলমান প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক, কৌশলগত ও রেমিট্যান্স সম্পর্ক থাকা দেশগুলো সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। তাঁর মতে, এনসিপির সঙ্গে বৈঠকগুলোও এই কূটনৈতিক যোগাযোগের অংশ।
জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার কারণে বিদেশিরা এনসিপিকে জোটের অংশ হিসেবে দেখছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, বিদেশিরা এনসিপিকে কোনোভাবেই জামায়াতের চোখে দেখে না; বরং একটি পৃথক ও স্বাধীন রাজনৈতিক দল হিসেবেই মূল্যায়ন করে।
তাঁর মতে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এনসিপি কার্যকর ভূমিকা রাখবে—এমন প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক মহলে রয়েছে। একই সঙ্গে তরুণদের সক্রিয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও দলটির ভূমিকার দিকে নজর রয়েছে।
সব মিলিয়ে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা এনসিপির প্রতি পশ্চিমা কূটনীতিকদের ধারাবাহিক যোগাযোগ দলটির আন্তর্জাতিক গুরুত্বের বিষয়টি সামনে এনেছে। নির্বাচন, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, রাষ্ট্র সংস্কার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিদেশিদের সঙ্গে এনসিপির নিয়মিত আলোচনা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলটির অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।