রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষকসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় আসামিদের জবানবন্দিতে নতুন তথ্য উঠে এসেছে। আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আসামিরা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীকে বাসার ছাদে হত্যা করার বিশদ বিবরণ দিয়েছে। তিনজনকে ছাদে শ্বাসরোধে হত্যার পর তারা দোতলায় ঘরের ভেতরে ঢুকে ছোট ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মকে হত্যা করে বলে নিশ্চিত করেছে। আদালতের বিশ্বস্ত সূত্র, মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও পুলিশের বিভিন্ন সূত্র এই নতুন তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
আদালতে দেওয়া আসামি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পূর্বের প্রাথমিক ধারণার চেয়ে অপরাধ সংঘটনের বিস্তারিত চিত্রে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। জবানবন্দিতে তারা জানায়, গত ২১ আগস্ট শুক্রবার ভোররাতে তারা পাশের বাসার ছাদ পেরিয়ে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর দোতলার ছাদে প্রবেশ করে। সেখানে পানির ট্যাঙ্কির পাশে বসে তারা দুজন ইয়াবা সেবন করছিল। একপর্যায়ে ভোর হয়ে গেলে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ছাদে এসে তাদের দেখতে পান এবং সেখানে মাদক সেবনে বাধা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আসামিরা শিক্ষক গণপতিকে তার গলায় থাকা গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। হত্যা নিশ্চিত করার পর ঘটনা আড়াল করতে মরদেহটি ছাদের এক কোণে নিয়ে টিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।
হত্যাকাণ্ডের সময় শিক্ষক গণপতির সাথে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে এবং তিনি বাঁচার জন্য চিৎকার করার চেষ্টা করেন। টিনের শব্দ ও ধস্তাধস্তির আওয়াজ পেয়ে ছাদে উঠে আসেন শিক্ষক গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী। সে সময় আসামিরা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ওপরও চড়াও হয়। মুগ্ধ গামছা দিয়ে প্রীতিলতার গলা পেঁচিয়ে ধরে এবং সিদ্ধার্থ প্রার্থী চক্রবর্তীর মুখ ও গলা চেপে ধরে। একপর্যায়ে প্রীতিলতা মারা গেলে দুজন মিলে রশি ও গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে প্রার্থীরও মৃত্যু নিশ্চিত করে। পাশের কোনো বাড়ি বা ছাদ থেকে যেন জোড়া মরদেহ দেখা না যায়, সেজন্য কৌশলে মা ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়ির কাছে এনে রেখে দেয় খুনিরা।
ছাদের তিনটি হত্যাকাণ্ড শেষে তারা নিচে নেমে এলে দেখতে পায় ছোট ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম ঘুম থেকে জেগে উঠে বিছানায় বসে আছে। প্রিয়ম আসামি সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলায় তাকেও নিঃশংসভাবে হত্যা করে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। চারজনকে হত্যার পর বাড়িতে সিসি ক্যামেরা থাকতে পারে এমন সন্দেহে নিচতলায় নেমে বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় সিদ্ধার্থ। টানা হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা ক্লান্ত হয়ে পড়লে সেখানে গোসল করে, খেজুর ও শসা খায় এবং পুনরায় আরও এক পিস ইয়াবা সেবন করে।
পরবর্তী সময়ে পুরো ঘটনাটিকে ডাকাতির রূপ দিতে ঘরের আসবাবপত্র ও জিনিসপত্র এলোমেলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়। এরপর তারা ঘর থেকে ১৫ হাজার টাকা ও কিছু স্বর্ণালঙ্কার লুট করে জুমার নামাজের সময় ছাদ দিয়ে পালিয়ে যায়। সংগৃহীত ১৫ হাজার টাকা মুগ্ধ নিজে নেয়। ওই দিন সন্ধ্যার দিকে প্রতিবেশী পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পাশে লুটের স্বর্ণালঙ্কার মাটিতে পুঁতে রাখে সিদ্ধার্থ। পেশায় স্বর্ণকার হওয়ায় সিদ্ধার্থ ওই বাসায় গহনা বের করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে তা পরীক্ষাও করেছিল।
উল্লেখ্য, রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে অবসরে যান। অবসর গ্রহণের পর তিনি নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় নতুন বাড়ি নির্মাণ করে পরিবার নিয়ে বসবাস করছিলেন এবং পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্রদান করতেন। গত শনিবার রাতে তার বাস ভবন থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এবং পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে ময়নাতদন্ত ও প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করে। চারজনকে হত্যার পর ময়নাতদন্ত শেষে নগরের দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক রহস্য উন্মোচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিস্তারিত তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।