অমর গুপ্ত, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট রক্তাক্ত হয়েছিল ফুলবাড়ীর রাজপথ। দেশের সম্পদ রক্ষা এবং বহুজাতিক কোম্পানি এশিয়া এনার্জির স্থানীয় কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে তৎকালীন বিডিআরের গুলিতে তরিকুল, আমিন ও সালেকিন নামে তিন তরুণ নিহত হন। আহত হন দুই শতাধিক আন্দোলনকারী। সেই ঘটনার ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ বুধবার (২৬ আগস্ট)। প্রতিবছর দিনটি ‘ফুলবাড়ী দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।
আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহতদের মধ্যে প্রদীপ সরকার দীর্ঘদিন শারীরিক কষ্ট ভোগ করে মারা যান। অন্যদিকে গুলিবিদ্ধ বাবলু রায় ও শ্রীমান বাস্কে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছেন। ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির দুই দশক পেরিয়ে গেলেও আন্দোলনকারীদের ছয় দফা দাবির পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফুলবাড়ী কয়লাখনিতে প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন টন কয়লা রয়েছে। ১৯৯৪ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সংস্থা বিএইচপির সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়। পরে এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সরকার ৩০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি করে।
প্রস্তাবিত ওই চুক্তি অনুযায়ী, উত্তোলিত কয়লার মাত্র ৬ শতাংশ বাংলাদেশ পাবে এবং ৯৪ শতাংশ পাবে এশিয়া এনার্জি। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ কয়লা রপ্তানি করার কথা ছিল। প্রস্তাবিত কয়লাখনি বাস্তবায়িত হলে ফুলবাড়ী শহরসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যেতে পারে। এতে কৃষি ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পরিবেশবাদী ও স্থানীয়রা আন্দোলনে নামেন। গঠন করা হয় ‘ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটি’।
২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট তেল-গ্যাস, খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি বহুজাতিক কোম্পানি এশিয়া এনার্জির ফুলবাড়ী কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করে। ফুলবাড়ী, বিরামপুর, পার্বতীপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার হাজার হাজার নারী-পুরুষ ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন।
মিছিলটি ছোট যমুনা সেতুর পূর্ব পাশে পৌঁছালে পুলিশ ও বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) গুলি চালায়। এতে কলেজছাত্র তরিকুল, কর্মজীবী আমিন ও সালেকিন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। আহত হন দুই শতাধিক আন্দোলনকারী। গুলির ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে পুরো খনি এলাকার মানুষ। পরে শুরু হয় অনির্দিষ্টকালের হরতাল ও অবরোধ।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট ছয় দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার চুক্তির কিছু অংশ বাস্তবায়ন করলেও সব দাবি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি বলে আন্দোলনকারীরা দাবি করে আসছেন। চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে খনি অঞ্চলের মানুষ এখনও আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
ছয় দফা চুক্তির অন্যতম দাবি ছিল এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়ী ও দেশ থেকে বহিষ্কার করা। পাশাপাশি ফুলবাড়ীসহ দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার দাবি ছিল। গুলিতে নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থার কথাও চুক্তিতে ছিল।
এ ছাড়া গুলি বর্ষণ ও হতাহতের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত কমিটি গঠন, নিহতদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, এশিয়া এনার্জির দালালদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির ব্যবস্থা এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার ও নতুন করে মামলা না করার দাবিও ছিল।
ছয় দফা সমঝোতা চুক্তির পর আন্দোলনের তীব্রতা কমে আসে। তবে দুই দশক পরও চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় ফুলবাড়ীর মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। এ কারণে প্রতিবছরের মতো এবারও ২৬ আগস্ট ‘ফুলবাড়ী দিবস’ পালনের মধ্য দিয়ে শহীদদের স্মরণ এবং ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের প্রত্যাশা জানানো হবে।