ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা ও সংঘাত আরও বাড়াবে বলে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে চীন। একই সঙ্গে বেইজিং স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তেহরানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।
এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সময় এই বিষয়ে বেইজিংয়ের শক্ত অবস্থানের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি অতীতে কখনো কোনো আন্তর্জাতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না। বরং এই ধরনের আক্রমণাত্মক নীতি কেবল সংঘাতকে উসকে দেয় এবং এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব আশপাশের অঞ্চল ছাড়িয়ে পুরো বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর ছড়িয়ে পড়ার চরম ঝুঁকি তৈরি করে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের এই বৈশ্বিক সহযোগিতা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে চলে আসছে বলে জানানো হয়। সেই কারণে কোনো তৃতীয় দেশের একপাক্ষিক নীতির ফলে এই পারস্পরিক সম্পর্ক বিঘ্নিত হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পাশাপাশি পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার কথা জানিয়ে বলা হয়, নিজেদের সার্বভৌম অধিকার, বাণিজ্য ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ দৃঢ়ভাবে রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরান থেকে তেল কেনা দেশগুলোর বিরুদ্ধে একটি নজিরবিহীন অর্থনৈতিক অভিযান চালানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার পরেই বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এই চরম প্রতিক্রিয়া এলো। উল্লেখ্য, ইরানের উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের প্রধান ও সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলো চীন। একটি সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে, গত বছরগুলোতে ইরান যে বিপুল পরিমাণ তেল বিশ্ববাজারে রপ্তানি করেছে, তার সিংহভাগই ক্রয় করেছে বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশ চীন।
জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালি বেইজিংয়ের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও সংবেদনশীল। কারণ এশিয়া মহাদেশ তথা সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এই প্রধান জলপথটি কৌশলগতভাবে অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। বাজার বিশ্লেষণকারী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চীন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রতি বছর যে বিশাল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে, তার একটি উল্লেখযোগ্য বড় অংশ সরাসরি এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই বেইজিংয়ে পরিবাহিত হয়।
এই বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যে দেখা দেওয়া সাম্প্রতিক সামরিক ও কূটনৈতিক সংকট এবং ইরানের ওপর মার্কিন প্রশাসনের নতুন এই কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কেবল তেহরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপরই বড় ধাক্কা দেবে না, বরং তা চীনের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্কের ওপরও সরাসরি ও গভীর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।