সরকারের কোনো হুমকি-ধমকি ও নাটকীয়তায় কান না দিয়ে জনগণের মৌলিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাজপথে অবিচল থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দেশের ১৮ কোটি মানুষের ভোটাধিকার, সুশাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই লড়াইতে প্রয়োজন হলে নিজের জীবন উৎসর্গ করবেন, তবুও দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছেড়ে ঘরে ফিরে যাবেন না। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত ঢাকা-রংপুর লংমার্চের অংশ হিসেবে বগুড়ার ঐতিহাসিক মাটিডালি বিমান মোড়ে অনুষ্ঠিত এক বিশাল পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কড়া কথা বলেন। সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে যাত্রা শুরু করা এই লংমার্চের বহর বগুড়ায় পৌঁছালে স্থানীয় জনতার বাঁধভাঙা জোয়ারে পুরো এলাকা এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
বগুড়ার গণসমাবেশে বক্তব্য প্রদানকালে জামায়াত প্রধান বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ১৪০০ সন্তানের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে সরকার গঠিত হয়েছে, তারা বিগত সাত মাসেও বিপ্লবের মূল সনদ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ক্ষমতায় আরোহণের পূর্বে কোটি তরুণকে চাকরি দেওয়ার সুন্দর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বর্তমানে তাদের হাতে চাঁদাবাজির চাবি তুলে দেওয়া হয়েছে এবং দুর্নীতির রেট বহুলাংশে বৃদ্ধি করা হয়েছে। দেশের ৭০ শতাংশ জনগণ গণভোটে 'হ্যাঁ' এর পক্ষে রায় দেওয়া সত্ত্বেও সরকার কেন সেখান থেকে সরে এসে জনগণের সাথে প্রতারণা করল—সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চলমান তীব্র সংকট প্রসঙ্গে বিরোধী নেতাদের পূর্বতন স্লোগান স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে তারা আবারও 'গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে' স্লোগান তুলতে বাধ্য হচ্ছেন।
কৃষি খাত ও বিদ্যুতের দূরবস্থা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, দেশের প্রাণ কৃষক আজ ন্যায্য মূল্যে সার পাচ্ছে না; ১৪০০ টাকার সার তাদের ২২০০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। অথচ বিদ্যুতের গ্রাহকদের হাতে ভূতুড়ে ও দ্বিগুণ-তিনগুণ বিল ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাশের জেলা সিরাজগঞ্জের অধিবাসী বিদ্যুৎমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা করে তিনি তাঁকে চরম অপদার্থ হিসেবে আখ্যা দেন এবং বলেন, 'গ্রামে বিদ্যুতের তার লম্বা হওয়ায় বিদ্যুৎ দেওয়া যায় না'—মন্ত্রী মহোদয়ের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য জাতির সাথে এক ধরনের তামাশা। একই সাথে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিজেদের লোক বসিয়ে সাধারণ মানুষকে শোষণের যে নীলক নকশা চলছে, তা মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
আগামীর নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচির আগাম দিকনির্দেশনা দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ঘোষণা করেন, বর্তমান লংমার্চ ঢাকা থেকে রংপুরের দিকে হলেও আগামীতে তাদের লংমার্চ পরিচালিত হবে পঞ্চগড় থেকে সরাসরি রাজধানী ঢাকা অভিমুখে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, তাঁদের ঘোষিত ৮ দফা দাবি কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর নয়, বরং এটি পুরো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রাণের দাবি। সরকার যদি অনতিবিলম্বে এই ৮ দফা মেনে না নেয়, তবে জনগণ সাথে নিয়ে সরকার পতনের 'এক দফা'র সর্বাত্মক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য হবেন তারা। সম্প্রতি কুমিল্লায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের ১৩ বছরের শিশু সন্তান অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মর্মান্তিক ঘটনা তুলে ধরে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি বিনীত আহ্বান জানিয়ে দেশের মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধানের দাবি জানান।
বগুড়া জেলা ও মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেলের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই পথসভায় সংহতি জানিয়ে বক্তব্য ও উপস্থিতি প্রদান করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ স্থানীয় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।