ব্রাজিলিয়ান বা মার্কিন ক্রীড়া সংস্কৃতির মতো ফুটবল বিশ্বে কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের জার্সি নম্বর স্থায়ীভাবে তুলে রাখার প্রচলন বেশ বিরল। যুক্তরাষ্ট্রের এনবিএ (NBA) বা এমএলবি (MLB)-র মতো জনপ্রিয় লিগগুলোতে অসাধারণ অবদান রাখা তারকাদের স্মরণে তাদের জার্সি নম্বর আজীবনের জন্য সংরক্ষণ করা একটি প্রচলিত ঐতিহ্য। যেমন মার্কিন বাস্কেটবল কিংবদন্তি বিল রাসেলের ৬ নম্বর জার্সি কিংবা কোবে ব্রায়ান্টের ৮ ও ২৪ নম্বর জার্সি লস অ্যাঞ্জেলেস লেকার্স চিরতরে সংরক্ষণ করেছে।
এমনকি
ফুটবল দুনিয়াতেও এমন কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা দেখা যায়; যেমন মর্মান্তিক প্রয়াণের পর ডিয়েগো জোতার
স্মরণে লিভারপুল তাদের ২০ নম্বর জার্সিটি
তুলে রেখেছিল। এছাড়া আয়াক্সে ইয়োহান ক্রুইফের ১৪ নম্বর কিংবা
এসি মিলানে পাওলো মালদিনির ৩ নম্বর জার্সিও
সংরক্ষিত রয়েছে। তবে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মহাতারকা লিওনেল মেসির রূপকথার অমর কাব্য লেখা ১০ নম্বর জার্সিটি
কেন জাতীয় দলের পক্ষ থেকে চিরতরে অবসরে পাঠানো সম্ভব নয়—এই প্রশ্নটি
এখন বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর পেছনের মূল
রহস্য লুকিয়ে রয়েছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্র সংস্থা ফিফার একটি কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নিয়মে।
বিদেশি
সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিকের ফুটবল বিশ্লেষক এদুয়ার্দো ট্যান্সলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিফা এবং ফিফা মহাদেশীয় প্রতিযোগিতাগুলোর অফিশিয়াল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি জাতীয় দলকে তাদের স্কোয়াডের খেলোয়াড়দের জন্য ধারাবাহিক বা ক্রমিক নম্বর
ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যেমন—২০২৬ সালের বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে দলগুলোর স্কোয়াড ২৬ সদস্যের হওয়ায়
জার্সি নম্বরগুলোকে ১ থেকে ২৬
পর্যন্ত ক্রমানুসারে সাজাতে হয়েছিল। আর ফিফার এই
বাধ্যতামূলক নিয়মের বেড়াজালেই জাতীয় দলের জার্সির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নম্বর চিরতরে তুলে রাখা আইনত অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আর্জেন্টিনা
ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (AFA) অতীতেও এই আইনি বাধ্যবাধকতা
ভাঙার চেষ্টা করেছিল। ফুটবলের রাজপুত্র ডিয়েগো মারাদোনার অসামান্য অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০০২ বিশ্বকাপের আগে তারা ১০ নম্বর জার্সিটি
স্থায়ীভাবে অবসরে পাঠানোর বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছিল ফিফার কাছে। তবে ফিফা সেই আবেদন সরাসরি নাকচ করে দেয়, যার ফলে সেবার মারাদোনার ঐতিহাসিক জার্সি পরে মাঠে নেমেছিলেন এরিয়েল ওর্তেগা। যদিও ক্লাব ফুটবলের নিয়ম অনেক বেশি নমনীয় হওয়ায় ইতালিয়ান ক্লাব নাপোলি মারাদোনার সম্মানে তাদের ১০ নম্বর জার্সিটি
চিরতরে তুলে রেখেছিল। তা সত্ত্বেও ফিফার
কনিষ্ঠ এই নিয়ম অনুযায়ী
আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের ক্ষেত্রে এএফএ চাইলে কিছুটা ছাড় দিতে পারে, কারণ প্রীতি ম্যাচে স্কোয়াড নম্বরের বাধ্যবাধকতা থাকে না।
ডিয়েগো
মারাদোনার হাত ধরে শুরু হয়ে মারিও কেম্পেসের পথ পেরিয়ে লিওনেল
মেসির কাঁধে এসে এই ১০ নম্বর
জার্সিটি বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতীকে
পরিণত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক জার্সিটি
সম্পর্কে ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লিওনেল
মেসি বলেন, “আমরা সবাই ভেবেছিলাম খেলোয়াড় হিসেবে আমরা একটু আলাদা। এমনকি যদি তা না-ও
হতো, ছোটবেলা থেকেই আমরা সবাই ১০ নম্বর জার্সিটা
পরতে চেয়েছি। স্পষ্টতই, এটি সবসময়ই একটি বিশেষ জার্সি।”
মেসির
বর্ণিল অধ্যায় শেষ হওয়ার পর এই পবিত্র
১০ নম্বর জার্সিটি কে গায়ে জড়াবেন,
তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। বর্তমান গুঞ্জন অনুযায়ী এই জার্সি পাওয়ার
দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন ইতালিয়ান ক্লাব কোমোর তরুণ প্রতিভা নিকো পাজ এবং রিয়াল মাদ্রিদের উদীয়মান তারকা ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনো—যাঁরা দুজনেই বাঁ-পায়ের সৃজনশীল মিডফিল্ডার। এছাড়া ক্লাব ফুটবলে একই নম্বর পরা লিভারপুলের অভিজ্ঞ তারকা অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের নামও সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
এ
বিষয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি ফিফাকে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, “আমরা লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচের জন্য অপেক্ষা করব এবং দেখব কী ঘটে। আমাদের
মূল ধারণা হলো, যেকোনো একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড় এই জার্সিটি নিজের
করে নেবে।” ফলে ফিফার কঠোর নিয়মের বেড়াজালে মেসির ১০ নম্বর জার্সি
জাদুঘরে ঠাঁই না পেলেও, আকাশি-নীল জার্সিতে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে এই নম্বরের জাদুকরী
উত্তরাধিকার ঠিকই সচল থাকবে।