প্রতিবেশী দেশ ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের পরিচালিত আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কেঁপে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব। দেশটির দুটি প্রধান বিমানবন্দরে সংঘটিত এই ভয়াত্মক হামলার ফলে তিনজন বিদেশি নাগরিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এপির প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, এই মর্মান্তিক ঘটনার মধ্য দিয়ে তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরব চলমান আঞ্চলিক যুদ্ধে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ার তীব্র শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সৌদি জেনারেল অথরিটি ফর সিভিল এভিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের আবহা বিমানবন্দর এবং রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই জোড়া হামলার ঘটনা ঘটে। যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ এই হামলার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো পক্ষকে সরাসরি দায়ী করেনি, তবে ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি ইতোমধ্যে এই বিমানবন্দরগুলোতে হামলার সম্পূর্ণ দায় স্বীকার করেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আবহা বিমানবন্দরে আঘাত হানা হামলায় মরক্কো ও আলজেরিয়ার দুজন বিদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৮ জন মানুষ। অন্যদিকে, রাজধানী রিয়াদের সুরক্ষিত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সংঘটিত হামলায় একজন সুদানি নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন আরও আটজন।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাজধানী রিয়াদ লাগাতার হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার কারণে এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা চরমভাবে জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরের নিকটবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান তেল কোম্পানি আরামকোর জ্বালানি ট্যাংক ও সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামগুলোর চারপাশে নতুন করে শক্তিশালী সুরক্ষাবেষ্টনী স্থাপন করা হয়েছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত সৌদি আরব সাম্প্রতিক সময়ে তাদের দেশের বিভিন্ন কৌশলগত তেলক্ষেত্র ও সামরিক স্থাপনাগুলোতে একের পর এক হামলার শিকার হচ্ছে। এর ফলে কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির বিকল্প নৌপথগুলোও চরম হুমকির মুখে পড়েছে। চলমান আঞ্চলিক সংঘাত ও উত্তেজনার জেরে ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলের হার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
হুথি বিদ্রোহীদের এই আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ময়দানে সক্রিয় রয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। এই জোটের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি গণমাধ্যমকে জানান যে, তাঁদের প্রতিরক্ষা বাহিনী সফলভাবে রিয়াদের উত্তরাঞ্চলে ধেয়ে আসা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই প্রতিহত করে ধ্বংস করে দিয়েছে। পাশাপাশি, ইয়েমেনের রাজধানী সানায় অবস্থিত যে লঞ্চিং প্যাড ব্যবহার করে সৌদি রাজধানীতে এই ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপ করা হয়েছিল, বিমান হামলা চালিয়ে সেটিকেও সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে যে, সৌদি জোটের এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে সৌদি আরব এবং তাদের মিত্র ইয়েমেনি বাহিনী যৌথভাবে প্রায় এক মাস আগে একটি বড় ধরনের স্থল ও বিমান অভিযান শুরু করে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় লোহিত সাগর উপকূলীয় অঞ্চল এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের যেসব এলাকা বিদ্রোহীরা জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছিল, তা পুনরুদ্ধার করা। মূলত এই অঞ্চলগুলোতে অবস্থান নিয়ে হুথিরা সৌদি-সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপরিবহনের ওপর কঠোর অবরোধ ও নজরদারি চালিয়ে আসছিল। সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের যৌথ বাহিনী ইতিমধ্যে এই প্রণালির আশপাশে অবস্থিত বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকা সফলভাবে পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ পণ্যসামগ্রী এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালির বুক চিরে পরিবাহিত হয়ে থাকে। (সূত্র: এপি)