বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জটিল প্রক্রিয়া নিয়ে আবারও নিজেদের আনুষ্ঠানিক ও সুনির্দিষ্ট অবস্থান স্পষ্ট করেছে ভারত সরকার। নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন যে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবাসনের সম্পূর্ণ বিষয়টি একটি নিরেট আইনি ও কাঠামোগত ব্যাপার। এই প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক বা সংক্ষিপ্ত শর্টকাট গ্রহণের সুযোগ নেই, বরং প্রচলিত আইনগত বিধান ও দীর্ঘমেয়াদি বিচারিক পথেই সবকিছু সম্পন্ন করা হবে। একই সঙ্গে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সর্বদা একটি ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখতে অত্যন্ত আন্তরিক এবং সেই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যেই কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনা সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এর আগে রাজধানী ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত মর্যাদাপূর্ণ ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ এর ‘পাওয়ার অ্যান্ড প্রুডেন্স’ শীর্ষক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও এই প্রসঙ্গের ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করেন। শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, এই পুরো বিষয়টি একটি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার অধীনে পরিচালিত হয় এবং এটি অত্যন্ত কাঠামোগত একটি বিষয়। যেহেতু এই স্পর্শকাতর প্রক্রিয়ার সঙ্গে দেশের বিচার বিভাগ ও আদালত সরাসরি ও গভীরভাবে সম্পৃক্ত, ফলে বাইরের কেউ চাইলেও এই বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বা ডেডলাইন বেঁধে দেওয়া মোটেও সম্ভব নয়।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনার নাটকীয়ভাবে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার সেই উত্তাল দিনগুলোর প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন ভারতীয় হাইকমিশনার। দীনেশ ত্রিবেদী পরিষ্কার করে জানান যে, ভারতের সামরিক বাহিনী কিংবা এয়ারফোর্স তাঁকে জোর করে বা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ভারতে নিয়ে আসেনি। বরং বাংলাদেশে সেই সময় এক চরম উদ্বেগজনক, অস্বাভাবিক ও মর্মান্তিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে তিনি কাগজে-কলমে ও সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং সেই অভাবনীয় সংকটে তাঁর বহনকারী সামরিক উড়োজাহাজটি ভারতীয় ভূখণ্ডে অবতরণের অনুমতি চাওয়া হলে ভারতের সামনে তা প্রত্যাখ্যান করার মতো কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প ছিল না। একটি দায়িত্বশীল নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে সেই জটিল ও অভূতপূর্ব পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই ছিল তাদের একমাত্র নৈতিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদনপত্র জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে নয়াদিল্লি বরাবরই এটি পরিষ্কার করে আসছে যে, দুই দেশের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ বিচারিক প্রক্রিয়াগুলোর আলোকেই এই অনুরোধ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তাড়াহুড়ো করে এ বিষয়ে কোনো একপাক্ষিক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।
দুই দেশের ঐতিহাসিক ও বহুস্তরভিত্তিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করে হাইকমিশনার ত্রিবেদী আরও জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক কেবল কোনো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক স্বার্থ বা লেনদেনের সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বরং এর গভীরে রয়েছে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং মনস্তাত্ত্বিক আত্মিক বন্ধন। একটি দায়িত্বশীল প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত যেকোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে সবসময় বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশের পাশে রয়েছে। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে নিজস্ব নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক মূল্যায়ন করতে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম বলে উল্লেখ করে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, পারস্পরিক অকৃত্রিম আস্থা, শ্রদ্ধাবোধ ও বিশ্বাসের মজবুত ভিত্তির ওপর ভর করেই আগামী দিনে দুই দেশের যৌথ অংশীদারিত্ব আরও বেশি সুদৃঢ় ও গতিশীল হবে।