সাইকেল চালানো শরীরচর্চার অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম। নিয়মিত সাইকেল চালালে হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পেশির শক্তি বাড়ানো এবং মানসিক চাপ কমানোর মতো একাধিক উপকার পাওয়া যায়। দৌড়ের তুলনায় হাঁটু ও অন্যান্য জয়েন্টের উপর চাপও তুলনামূলক কম পড়ে। তাই ফিটনেস ধরে রাখতে অনেকেই প্রতিদিন সাইক্লিং করেন। তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ সাইক্লিং নিয়ে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাইকেল চালালে কি অজান্তেই প্রজননস্বাস্থ্যের উপর প্রভাব পড়তে পারে? বিশেষ করে শুক্রাণুর সংখ্যা, গতিশীলতা বা গুণমান কি কমে যেতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইক্লিং করলেই পুরুষের ফার্টিলিটি নষ্ট হয়—এমন ধারণার পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই। সাধারণ বা মাঝারি মাত্রায় সাইক্লিং করা সাধারণত সমস্যা তৈরি করে না। উদ্বেগের বিষয় মূলত তাঁদের ক্ষেত্রে, যাঁরা নিয়মিত দীর্ঘ সময় ধরে বা অত্যন্ত তীব্র গতিতে সাইকেল চালান। সাইক্লিংকে সরাসরি বন্ধ্যত্বের কারণ বলা ঠিক নয়। শুধু সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে পুরুষদের সাইক্লিং পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ারও প্রয়োজন নেই।
তবে দীর্ঘ সময় সাধারণ সিটে বসে সাইকেল চালানো বা একটানা কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত জোরে সাইক্লিং করার ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একটি গবেষণায় সপ্তাহে পাঁচ ঘণ্টা বা তার বেশি সাইক্লিং করা পুরুষদের মধ্যে শুক্রাণুর ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং কম গতিশীল শুক্রাণুর ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর অর্থ এই নয় যে সপ্তাহে দু’-তিন দিন অল্প সময় সাইকেল চালালেই একই ধরনের সমস্যা হবে। মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চা এবং নিয়মিত দীর্ঘ সময়ের উচ্চমাত্রার সাইক্লিংকে একভাবে দেখা উচিত নয়।
দীর্ঘক্ষণ সাইকেলের সিটে বসে থাকলে শরীরের দুই পায়ের মাঝের অংশ, অর্থাৎ পেরিনিয়ামের উপর দীর্ঘ সময় চাপ পড়ে। সিটের চাপ ও ঘর্ষণের পাশাপাশি ওই অংশের তাপমাত্রাও বেড়ে যেতে পারে। পুরুষের অণ্ডকোষের আশপাশের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হলে শুক্রাণু তৈরির প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই দীর্ঘক্ষণ সাইক্লিং করা পুরুষদের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা ও চাপ—দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শুধু তাপমাত্রাই নয়, ভুল ধরনের বা অনুপযুক্ত সিট ব্যবহার করলেও সমস্যা হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকার কারণে পেরিনিয়ামের স্নায়ু ও রক্তনালীর উপর চাপ তৈরি হতে পারে। এতে ওই অঞ্চলে সাময়িকভাবে রক্তসঞ্চালন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে শুক্রাণুর সংখ্যা, গতিশীলতা এবং গঠনের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে গবেষণায় উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। অতিরিক্ত সময় ধরে কঠিন ওয়ার্কআউট করলে শুধু পেরিনিয়ামের উপর চাপই পড়ে না, শরীরের উপর সামগ্রিক শারীরিক চাপও বাড়ে। অত্যন্ত কঠিন ও দীর্ঘ সাইক্লিংয়ের সঙ্গে হরমোনের সাময়িক পরিবর্তনের সম্পর্ক থাকতে পারে।
কিছু গবেষণায় অতিরিক্ত সাইক্লিংয়ের সঙ্গে বীর্যে প্রদাহজনিত উপাদান এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বৃদ্ধির সম্পর্কও পাওয়া গেছে। শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বেড়ে গেলে শুক্রাণুর গুণমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শুক্রাণুর ঘনত্ব, গতিশীলতা এবং গঠন—এই তিনটি বিষয়ই পুরুষের ফার্টিলিটির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাই দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার সাইক্লিং করা পুরুষদের ক্ষেত্রে শুধু ব্যায়ামের সময় নয়, শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। সাইক্লিং শুরু করার কয়েক দিন পরেই শুক্রাণুর মানে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাবে—এমন নয়। শুক্রাণু তৈরি ও পরিণত হওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় আড়াই থেকে তিন মাস সময় লাগে। ফলে জীবনযাত্রায় কোনো পরিবর্তন করলে তার প্রভাব বীর্যের গুণমানে দেখা দিতে সাধারণত কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। এই কারণেই ফার্টিলিটি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে শুধু সাম্প্রতিক কয়েক দিনের অভ্যাসের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। দীর্ঘ সময়ের জীবনযাপন, শরীরচর্চার ধরন, খাদ্যাভ্যাস, বিশ্রামসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করতে হয়।
একেবারেই নয়। সাইক্লিংয়ের স্বাস্থ্যগত উপকার অনেক। নিয়মিত মাঝারি মাত্রার সাইক্লিং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সামগ্রিক শারীরিক ও যৌনস্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে। প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মতো মাঝারি মাত্রার সাইক্লিং সাধারণত নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হয়। সমস্যা নিয়ে বেশি সতর্ক হতে হবে তাঁদের, যাঁরা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় সাইকেল চালান বা খুব উচ্চমাত্রার প্রশিক্ষণ নেন।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মেনে চলা যেতে পারে। সাইকেলের সিট এমন হওয়া দরকার, যাতে পেরিনিয়ামের উপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। দীর্ঘ সময় সাইক্লিং করলে সিটের ধরন ও অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই অবস্থায় সিটে বসে না থেকে মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়া ভালো। প্রয়োজনে সাইকেল চালানোর সময় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে প্যাডেল করলেও পেরিনিয়ামের উপর চাপ কমানো সম্ভব। সাইক্লিংয়ের সময় বা পরে ওই অঞ্চলে ব্যথা, অসাড়তা, ঝিনঝিন করা বা অস্বস্তি হলে তা উপেক্ষা করা উচিত নয়। নিয়মিত এমন সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। ফিটনেস বাড়ানোর জন্য ব্যায়াম করা ভালো।
কিন্তু প্রতিদিন অত্যন্ত কঠিন ও দীর্ঘ ওয়ার্কআউট করার প্রয়োজন নেই। শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়াও প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখার ক্ষেত্রে অত্যধিক শরীরচর্চার চেয়ে নিয়মিত ও মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম বেশি উপকারী হতে পারে। সপ্তাহে প্রায় ১৫০ থেকে ১৮০ মিনিট শরীরচর্চা সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে। হাঁটা, হালকা দৌড়, সাঁতার, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম বা পরিমিত সাইক্লিং—বিভিন্ন ধরনের শরীরচর্চা রুটিনে রাখা যেতে পারে। একই ব্যায়াম প্রতিদিন অত্যধিক সময় ধরে করার পরিবর্তে শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী একটি ভারসাম্যপূর্ণ রুটিন তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।