মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রায় ১৭ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিশাল আকারের মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগের আওতায় দেশের ৭ লাখের বেশি শিক্ষককে একটি করে আধুনিক ট্যাবলেট কম্পিউটার (ট্যাব) দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত ১০টি করে স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন এবং ৩২টি জেলায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের আওতায় মাউশির অধীন দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ এবং মাদরাসার শিক্ষকরা অন্তর্ভুক্ত হবেন। ডিভাইস বিতরণের জন্য তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসংখ্যা, এমপিওভুক্তি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক সূচক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। প্রকল্প চূড়ান্ত হওয়ার পর এ সংক্রান্ত বিস্তারিত নির্দেশনা ও তালিকা প্রকাশ করা হবে।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ১০টি স্মার্ট ক্লাসরুম ও ব্রডব্যান্ড সংযোগ প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে কেবল শিক্ষকদের ডিজিটাল ডিভাইসের আওতায় আনা হচ্ছে না, বরং শ্রেণিকক্ষগুলোকেও প্রযুক্তিনির্ভর করা হচ্ছে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত ১০টি করে স্মার্ট ক্লাসরুম তৈরি করা হবে, যেখানে প্রতিটি কক্ষে থাকবে একটি করে আধুনিক ইন্টারেকটিভ এডুকেশন প্যানেল। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন পাঠদান ও ডিজিটাল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১০০ এমবিপিএস গতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হবে এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা হবে একক ও সমন্বিত ‘এডু আইডি’। এসব সুবিধার ফলে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাস পরিচালনার সুযোগ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
৩২ জেলায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে দেশের ৩২টি বৃহৎ জেলায় ‘হায়ার সেকেন্ডারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট’ (এইচএসটিটিআই) স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই খাতে প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য আঞ্চলিক পর্যায়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণের পরিধি প্রসারিত করা।
এছাড়া ‘হায়ার সেকেন্ডারি টিচার্স প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের’ (এইচএসটিপিডিপি) অধীনে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ লাখ শিক্ষককে ৩৫ দিনব্যাপী মিশ্র পদ্ধতির বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি ১০ হাজার অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষকে নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ এবং ৪ হাজার গভর্নিং বডি সদস্যকে সমন্বিত ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি প্রদান করা হবে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় চলমান ‘লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন’ (লেইস) প্রকল্পের মাধ্যমে তিন লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি শিক্ষককে বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ এরই মধ্যে চলমান রয়েছে। নতুন শিক্ষকদের বুনিয়াদি ও পেশাগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকদের মাধ্যমে আইসিটি প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কাউন্সেলিং ও জলবায়ু ঝুঁকি হ্রাস সংক্রান্ত বিশেষ প্রশিক্ষণও এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত।
এ প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, শিক্ষকতা পেশায় প্রকৃত মেধাবীদের আকৃষ্ট করার জন্য শিক্ষার মানোন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষকদের স্মার্ট ও দক্ষ করে গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।