ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬,  ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শ্রীপুরে বিকাশের ক্যাশ ম্যানেজারকে গুলি করে আড়াই কোটি টাকা ছিনতাই জলপরী কি সত্যিই আছে? হাজার বছরের পুরোনো মৎস্যকন্যার মিথের আসল ইতিহাস দীর্ঘক্ষণ সাইক্লিং কি পুরুষদের শুক্রাণুর মান কমিয়ে দেয়? জানুন বিশেষজ্ঞদের মতামত রাজনীতি হতে হবে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য: এলজিআরডি মন্ত্রী কে এই নাভি পিল্লে: বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেক নোবেল জয় জুনিয়র এনটিআর ও পুলিশ কমিশনারের এআই ছবি নিয়ে তীব্র বিতর্ক প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব নিশ্চিত করতে হবে: অর্থমন্ত্রী! জুমার পর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভ ইরানের ‘শ্যাডো ফ্লিটে’র ১৭ জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বিশ্ববাজারে ডলারের দরপতন ও তেলের দামে বাড়ল স্বর্ণের দাম

নরসিংদীর পুকুরে জলপরীর গুজবের আসল সত্য

জলপরী কি সত্যিই আছে? হাজার বছরের পুরোনো মৎস্যকন্যার মিথের আসল ইতিহাস


  • আপলোড সময় : শনিবার ১০ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ১:৫২ এএম

মৎস্যকন্যা বা জলপরী—অর্ধেক মানুষ ও অর্ধেক মাছের অবয়ব নিয়ে গঠিত এই কাল্পনিক চরিত্রটি নিয়ে মানবজাতির কৌতূহল ও বিস্ময়ের যেন কোনো অন্ত নেই। প্রাচীন সাহিত্য, লোককথা, পৌরাণিক উপাখ্যান থেকে শুরু করে আধুনিককালের সিনেমা, কার্টুন ও অ্যানিমেশন—সব জায়গাতেই নানা রঙে ও রূপে দেখা মিলেছে এই জলপরীর উপস্থিতি। মানব ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে কৌতূহল ও কল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই চরিত্রটি কভু সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, আবার কভু বা সমুদ্রযাত্রার এক অশুভ সংকেত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পৃথিবীর ভৌগোলিক অবস্থান ও সংস্কৃতি ভেদে এই জলজ কাল্পনিক চরিত্রের নাম ও রূপের নানা পরিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু মানুষের অবচেতন মনে ও কল্পনার জগতে এর চিরন্তন আবেদন আজও সমানভাবে অটুট রয়েছে।


সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার একটি সাধারণ পুকুরে জলপরী দেখা গেছে—এমন একটি অমূলক ও ভীতিপ্রদ গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি অস্পষ্ট ভিডিওকে কেন্দ্র করে টানা বেশ কয়েক দিন ধরে ওই পুকুরপাড় এলাকায় কৌতূহলী মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এমনকি স্থানীয় কিছু মানুষের মধ্যে অন্ধবিশ্বাস ও অজ্ঞতার বশে পূজা-অর্চনার মতো কুসংস্কারমূলক ঘটনারও পুনরাবৃত্তি ঘটে। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতিশীল ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পুকুরের প্রকৃত মালিকও ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে অবগত হয়ে দ্রুত গ্রামে ফিরে আসেন এবং প্রশাসনের কাছে সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন।


এরই ধারাবাহিকতায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো পুকুরে বড় বড় জাল ফেলে তল্লাশি চালানো হয় এবং সমস্ত মাছ জল থেকে তুলে ফেলা হয়। প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, ওই পুকুরে জলপরীর বিন্দুমাত্র কোনো অস্তিত্ব বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মূলত পানির নিচে একসঙ্গে প্রচুর মাছের ঝাঁক যখন একত্রে চলাচল করে, তখন ওপর থেকে দূরদৃষ্টিতে সেটিকে কোনো বিশাল ও অস্বাভাবিক প্রাণীর নড়াচড়া বলে মানুষের ভুল হতে পারে। অর্থাৎ, নরসিংদীর আলোচিত ঘটনাটি কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত জলপরীর অস্তিত্বের প্রমাণ বহন করে না; বরং একটি অস্পষ্ট ভিডিওকে কেন্দ্র করে কতিপয় মানুষের খামখেয়ালিপনায় তৈরি হওয়া সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন গুজব হিসেবেই এটি প্রমাণিত হয়েছে।


ইংরেজি মারমেইড শব্দটি মূলত দুটি আলাদা শব্দের নিখুঁত সমন্বয়ে গঠিত—যার একটি হলো মার এবং অন্যটি মেইড। মার শব্দটির সঙ্গে সুপ্রাচীনকাল থেকেই সমুদ্রের গভীর সম্পর্কের অর্থ জড়িয়ে রয়েছে, অন্যদিকে মেইড বলতে সাধারণ অর্থে কোনো তরুণী, মেয়ে বা যুবতীকে বোঝানো হয়ে থাকে। সাধারণ ও প্রচলিত অর্থে মারমেইড বলতে এমন এক কাল্পনিক পৌরাণিক জলজ প্রাণীকে বোঝানো হয়, যার শরীরের ওপরের অর্ধাংশ অবিকল মানুষের মতো এবং নিচের অর্ধাংশ মাছের লেজ বা দেহের মতো হয়ে থাকে।


যদিও প্রচলিত চিত্রকল্পগুলোতে সাধারণত নারী রূপের মৎস্যকন্যার উপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের লোককথা ও পুরাণে পুরুষ মারমেইড বা মারম্যান-এরও বেশ কিছু উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন লোককথায় এই জলপরীদের কখনও জাদুকরী ক্ষমতার অধিকারী, দীর্ঘায়ু সম্পন্ন ও ভীষণ রহস্যময় প্রাণী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার পৃথিবীর কোনো কোনো অঞ্চলের উপকথায় তাদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ দেখার অদ্ভুত ক্ষমতার মতো নানা অতিপ্রাকৃত বৈশিষ্ট্যও যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।


জলপরীর অস্তিত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন মানব সংস্কৃতিতে সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী ধারণা প্রচলিত রয়েছে। কোনো কোনো প্রাচীন সমাজে তাদের সমুদ্র, জীবন, উর্বরতা ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে সম্মান করা হতো। আবার এর বিপরীতে বহু লোককথায় জলপরীকে আকস্মিক বিপদ, ভয়ংকর সামুদ্রিক ঝড়, জাহাজডুবি কিংবা নিশ্চিত মৃত্যুর এক অশুভ পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিশেষ করে প্রাচীন যুগের সমুদ্রচারী ও নাবিকদের রোমাঞ্চকর গল্পে এই মৎস্যকন্যার উপস্থিতি সবসময়ই এক গভীর রহস্য ও অজানা আতঙ্কে পরিপূর্ণ থাকত। দীর্ঘ সময় ধরে অগাধ সমুদ্রে অবস্থানকারী নাবিকদের কাছে হঠাৎ পানির ওপর ভেসে ওঠা কোনো অদ্ভুত শব্দ, ছায়া বা নারীর আদলে গড়া অবয়ব খুব সহজেই নানা রহস্যময় ও অলৌকিক কাহিনির জন্ম দিতে সক্ষম হতো।


কিছু লোককথায় আবার মানুষের সঙ্গে জলপরীর প্রেম বা বিয়ের অবাস্তব ও রোমাঞ্চকর গল্পও পাওয়া যায়। এই ধরনের লোককাহিনিগুলোতে সাধারণত জলপরীর বিশেষ কোনো সামগ্রী যেমন—টুপি, বেল্ট, মাথার চিরুনি কিংবা রূপচর্চার আয়নার মতো কোনো জিনিস কৌশলে লুকিয়ে রাখার কথা উল্লেখ থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত সেই জাদুকরী জিনিসটি জলপরী নিজে খুঁজে না পায়, ততক্ষণ সে মানুষের সমাজে সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘরসংসার করে বসবাস করে—এমন অদ্ভুত কল্পকাহিনও পৃথিবীর নানা দেশের সংস্কৃতিতে বেশ জনপ্রিয়।


মৎস্যকন্যার এই অদ্ভুত মিথ ও গল্পের উৎপত্তি ঠিক কবে এবং কোন জনপদে হয়েছিল, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক উত্তর বা প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে মানবসভ্যতার বহু প্রাচীন ও আদিম সময় থেকেই পানির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত অতিপ্রাকৃত প্রাণী ও জল-দেবতার নানা কাহিনির সন্ধান মিলেছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাচীন মেসোপটেমীয় সংস্কৃতিতে পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এক পুরুষ মৎস্যদেবতার কাহিনির ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায়। কেলডীয় সাগরের সর্বশক্তিমান দেবতা ইয়া বা ওয়ানেস সম্পর্কে প্রাচীন মানুষের বিশ্বাস ছিল যে, তিনি প্রতিদিন নিয়মিত সমুদ্রের তলদেশ থেকে উঠে আসতেন এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে রাতে আবার নিজের আবাসস্থলে অর্থাৎ সমুদ্রে ফিরে যেতেন।


এরপর প্রাচীন সিরিয়ার ইতিহাসের পাতায় আতারগাতিস নামক এক কাল্পনিক দেবীর গল্প দেখতে পাওয়া যায়। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, তিনি জলের রূপ ধারণ বা পবিত্র হওয়ার উদ্দেশ্যে একবার গভীর পানিতে ডুব দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অসাধারণ ও অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে দেবতারা তাঁর পুরো শরীরকে শুধু মাছের রূপ দিতে পারেননি। ফলে তাঁর শরীরের নিচের অংশ অবিকল মাছের মতো হয়ে গেলেও ওপরের অংশ একজন অপরূপা মানবীর রূপেই থেকে যায়। এ ধরনের পৌরাণিক ও কাল্পনিক গল্পগুলো থেকেই পরবর্তীতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতায় মানুষের দেহের সঙ্গে জলজ প্রাণীর মিশ্র রূপের অভিনব ধারণাটি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করে।


মৎস্যকন্যার সুদীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনায় গ্রিক পুরাণের সাইরেন চরিত্রটির নামও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করতে হয়। গ্রিক পুরাণের বিভিন্ন উপাখ্যানে সাইরেনদের এমন একদল বিপজ্জনক প্রাণী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল, যারা নিজেদের অত্যন্ত জাদুকরী ও আকর্ষণীয় কণ্ঠের সুরের জাদুতে সাগরে চলাচলকারী নাবিকদের মোহিত ও প্রলুব্ধ করে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিত। তবে এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য হলো, প্রাচীনতম বর্ণনামতে সাইরেনদের শারীরিক গঠন পুরোপুরি মাছের মতো ছিল না; বরং তাদের শরীরের বর্ণনায় পাখির মতো ডানা বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর শিল্পকলা, চিত্রকাহিনি ও লোককথায় তাদের ধীরে ধীরে মাছের লেজযুক্ত মানবী রূপেই উপস্থাপন করা শুরু হয়। এর ফলে সময়ের প্রবাহে সাইরেন ও মৎস্যকন্যার প্রথাগত ধারণা অনেক ক্ষেত্রেই একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে একাকার হয়ে গেছে।


আফ্রিকার পশ্চিম, দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলেও জলসম্পর্কিত নানা পৌরাণিক ও লোকজ চরিত্রের দীর্ঘ প্রচলন রয়েছে। আফ্রিকার জনপদে প্রচলিত মামি ওয়াটা চরিত্রটি তাদের মধ্যে অন্যতম ও সর্বাধিক পরিচিত। মামি ওয়াটা শব্দটির আক্ষরিক অর্থের সঙ্গে জলের মা বা জলই মা–এর গভীর ধারণা ও ভক্তি জড়িয়ে রয়েছে। আফ্রিকার বিভিন্ন আদিবাসী সংস্কৃতিতে এই জল-দেবতা বা অলৌকিক আত্মার গল্প অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রচলিত হয়ে আসছে। পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিকতার বিস্তার এবং অমানবিক দাসপ্রথার রমরমা প্রসারের সময় আফ্রিকার এই লোকজ কাহিনিগুলো ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।


স্লাভিক লোককথায় জলপরী বা জল-দেবতার একটি অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় নাম হলো রুসালকি। শুরুর দিকে তাদের কৃষিকাজের সমৃদ্ধি, জমির উর্বরতা ও প্রকৃতির কল্যাণের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হলেও পরবর্তীতে তাদের অনেক ভয়ংকর গল্পে অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও হিংস্র রূপ প্রদান করা হয়। অন্যদিকে আয়ারল্যান্ডের প্রাচীন লোককথায় জলপরী মেরোজ নামে পরিচিত। নারী মেরোজদের অসাধারণ সুন্দর চেহারা এবং পিঠ ছাপানো লম্বা সবুজ চুলের রূপবর্ণনা পাওয়া যায়। এর বিপরীতে পুরুষ মেরোজদের অত্যন্ত কুৎসিত, বিকট এবং নিষ্ঠুর ও আক্রমণাত্মক স্বভাবের প্রাণী হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। স্কটল্যান্ডের লোককথার সেলকি চরিত্রটিও জলপরীর এই পৌরাণিক গল্পের সঙ্গে বেশ তুলনীয়। সেলকিরা মূলত সমুদ্রে সিল মাছের স্বাভাবিক জীবনযাপন করে এবং পরবর্তীতে ডাঙায় উঠে এসে মানুষের রূপ ধারণ করতে সক্ষম হয়—এমন আজব লোককথা আজও সেখানে প্রচলিত রয়েছে।


মধ্যযুগীয় ইউরোপের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও লোকজ কাহিনিতে মেলুসিনা নামক এক রহস্যময় জলপরীর চমৎকার গল্পের সন্ধান পাওয়া যায়। এই চরিত্রের বর্ণনায় কখনো তার নিচের লেজকে বিষাক্ত সাপের মতো, কখনো বা জলজ মাছের মতো এবং কোনো কোনো বর্ণনায় আবার পাখার মতো ডানাসহ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লোককথায় সুবর্ণমচ্ছা নামক এক পৌরাণিক চরিত্রের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।


এই শব্দটির সরল বাংলা অর্থ দাঁড়ায় সোনালী মাছ। হিন্দু ধর্মের মহাকাব্য রামায়ণের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্করণে এই বিশেষ চরিত্রের বিশদ উল্লেখ রয়েছে। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, লঙ্কা জয়ের উদ্দেশ্যে লহ্মণ ও হনুমান যখন সমুদ্রের ওপর বিশাল পাথর খণ্ড দিয়ে সংযোগকারী সেতু নির্মাণ করছিলেন, তখন সুবর্ণমচ্ছা সেই কাজে নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তীতে সুবর্ণমচ্ছার সঙ্গে হনুমানের পারস্পরিক বোঝাপড়া ও প্রেমের সুমধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তিনি স্বয়ং সেতু নির্মাণ কাজে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করেন। বর্তমান সময়ে কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ও লাওসের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী প্রতীক, তাবিজ ও জাতীয় সাংস্কৃতিক উপস্থাপনায় সুবর্ণমচ্ছার নান্দনিক ছবি দেদারসে দেখতে পাওয়া যায়।


আধুনিক বিশ্বে মৎস্যকন্যার এই কাল্পনিক চরিত্রটিকে বিশ্ববাসীর কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে সাহিত্যের অবদান অনস্বীকার্য। ডেনিশ জাতির প্রখ্যাত রূপকার ও লেখক হ্যানস ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসেনের অমর সৃষ্টি দ্য লিটল মারমেইড নামক রূপকথাটি জলপরীর চরিত্রটিকে বিশ্বজুড়ে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। ১৮৩৭ সালে প্রথম প্রকাশিত এই কালজয়ী রূপকথাটি পরবর্তীতে সুদীর্ঘ সময়ে বিশ্বজুড়ে নাট্যমঞ্চ, অপেরা, সাহিত্য ও বিভিন্ন শৈল্পিক মাধ্যমে সফলভাবে রূপান্তরিত হয়েছে।


তবে এরও অনেক পরে ১৯৮৯ সালে বিশ্বখ্যাত বিনোদন মাধ্যম ডিজনির পক্ষ থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র দ্য লিটল মারমেইড এই চরিত্রটিকে আজকের আধুনিক প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় করে তোলে। শুধু কাল্পনিক গল্প, উপন্যাস কিংবা সিনেমার পর্দায় নয়, প্রাচীন ইউরোপের রাজকীয় চিত্রকলা, ভাস্কর্য ও বিভিন্ন রাজকীয় প্রতীকেও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সময়ে মৎস্যকন্যার বর্ণিল উপস্থিতি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে জলপরী ধীরে ধীরে নিছক কোনো লোককথার কাল্পনিক চরিত্র বা রূপকথার গণ্ডি পেরিয়ে মানবসভ্যতার সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি ও আধুনিক বিনোদনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।


তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, আধুনিক বিজ্ঞানের এই যুগেও মানুষ কেন আজও জলপরীর অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপন করতে চায়? মূলত প্রাচীনকাল থেকেই সমুদ্র মানুষের কাছে এক অপার রহস্য ও গভীর ভয়ের জায়গা হিসেবে পরিচিত। বিশাল জলরাশি, সমুদ্রের অজানা ও অন্তহীন গভীরতা, অদ্ভুত সব সামুদ্রিক প্রাণীর বিচরণ এবং দূরপাল্লার সমুদ্রযাত্রার জীবনঘাতী ঝুঁকি—এই সমস্ত উপাদান একত্রিত হয়ে সমুদ্রকে ঘিরে অসংখ্য রোমাঞ্চকর কল্পকাহিনির জন্ম দিয়েছে। প্রাচীন যুগে দূর দিগন্ত থেকে ভেসে আসা কোনো অপরিচিত সামুদ্রিক প্রাণী, সমুদ্রের পানিতে আকস্মিক ভেসে থাকা কোনো কাঠের টুকরো বা ভাসমান বস্তু কিংবা ঢেউয়ের অদ্ভুত গতিবিধি সাধারণ মানুষের চোখে অনেক সময় জলপরীর জীবন্ত রূপ বলে মনে হতে পারে। সেই যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা বাস্তব অভিজ্ঞতা মুখে মুখে পরিবর্তিত হয়ে পরবর্তীতে একসময় সমৃদ্ধ লোককথায় রূপ নিয়েছে—জলপরীর মিথের পেছনের আসল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এটিই।


তবে আধুনিক বিজ্ঞান, সমুদ্রবিজ্ঞান এবং উন্নত সামুদ্রিক গবেষণায় মানুষের মতো ওপরের অবয়ব এবং নিচের অংশে মাছের লেজযুক্ত কোনো বাস্তব বা জীবিত প্রাণীর অস্তিত্বের কোনো ধরনের সত্যতা বা প্রমাণ এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে জলপরী হলো মূলত মানবজাতির সুদীর্ঘ ইতিহাসের পৌরাণিক কল্পনা, লোকবিশ্বাস এবং মানুষের মনের জল্পনা-কল্পনারই একটি শৈল্পিক রূপ।


নরসিংদীর সাম্প্রতিক মনোহরদীর ঘটনাটি আবারও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অস্পষ্ট ও সম্পাদিত ভিডিও কত দ্রুত সাধারণ মানুষের মনে অন্ধ কৌতূহল এবং ভিত্তিহীন গুজব তৈরি করতে সক্ষম হয়। একটি সাধারণ পুকুরে মাছের অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রাত্যহিক চলাচলকে জলপরীর অতিপ্রাকৃত উপস্থিতি হিসেবে প্রচার করা হলে তা মুহূর্তের মধ্যে দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই যেকোনো অস্বাভাবিক বা রহস্যজনক দৃশ্য কিংবা ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দেখা মাত্রই সেটিকে চোখ বুজে অন্ধের মতো সত্য বলে বিশ্বাস করে না নিয়ে, বরং সেটির সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করাই আধুনিক সচেতন নাগরিকের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।


এ সম্পর্কিত আরো খবর