অর্থনীতি ডেস্ক:
ভারতের
বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি নির্বিঘ্ন করতে স্থলবন্দরভিত্তিক বিভিন্ন বিধিনিষেধ এবং অশুল্ক বাধা অবিলম্বে দূর করার জোরালো দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি, বাংলাদেশি পাটপণ্য ও পেট ফিল্মের
ওপর দীর্ঘদিন ধরে আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহার এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশ উত্তরণের পরেও বর্তমান বাণিজ্য সুবিধাগুলো অব্যাহত রাখার বিষয়টি জোরালোভাবে বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
গতকাল
শুক্রবার (৯ অক্টোবর ২০২৬)
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের ১৬তম সভায় এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আলোচ্যসূচিতে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য
মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তার-এর নেতৃত্বে ১০
সদস্যের একটি উচ্চপর্যায় বিশিষ্ট বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে
অংশ নেয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ
বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত
করা হয়েছে।
দু’দিনব্যাপী চলমান এই বৈঠকে দ্বিপক্ষীয়
বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নানামুখী প্রতিবন্ধকতা নিরসন, স্থলবন্দরগুলোর অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক পণ্য পরিবহনব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করার
বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতীয় প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকেও আমদানি-রপ্তানিতে বিদ্যমান বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা দূর করা এবং পারস্পরিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের বেশ কিছু নতুন প্রস্তাব আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বৈঠকে
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেশীয় রপ্তানিকারকদের স্বার্থ সুরক্ষায় ভারতীয় স্থলবন্দরগুলো দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান অযৌক্তিক বিধিনিষেধগুলো পর্যালোচনা ও তা প্রত্যাহারের
বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। ভারতীয় বাজারে পণ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার সহজ করার লক্ষ্যে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা
অপসারণের পাশাপাশি অন্যান্য বাণিজ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিয়েও দুই দেশের প্রতিনিধিরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্বল্পোন্নত
দেশ (এলডিসি) হিসেবে উত্তরণের পর ভারতের বাজারে
বাংলাদেশের রপ্তানিপণ্যের শুল্কমুক্ত ও বিশেষ সুবিধা
কীভাবে অব্যাহত রাখা যায়, সেটিও এবারের আলোচনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়া (সাফটা) চুক্তির আওতায় বর্তমানে যে সুবিধাগুলো পাওয়া
যাচ্ছে, তা এলডিসি উত্তরণের
পরও বহাল রাখার জোরালো দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে পণ্যের মান নির্ধারণে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা, পারস্পরিক সার্টিফিকেশনের স্বীকৃতি এবং ‘ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস’
(বিআইএস)-এর প্রয়োজনীয় সনদ
প্রাপ্তির জটিল প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাজারে
সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করাও বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকারে রয়েছে। ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে খুব সহজেই বাংলাদেশ থেকে নেপাল ও ভুটানে সরাসরি
পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্পরিক সরাসরি যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা
আরও সুদৃঢ় করতে ‘সিইওস ফোরাম’কে দ্রুত কার্যকর
করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ।
স্থলবন্দর
দিয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন করতে ভারতের স্থল কাস্টমস স্টেশনগুলোর অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাও বৈঠকে তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রবেশপথ, পার্কিং ইয়ার্ড, প্রশস্ত গুদাম, পণ্য রাখার শেড এবং পণ্য পরীক্ষা ও কোয়ারেন্টাইন সুবিধা
বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সীমান্তবর্তী স্থলবন্দরগুলোর সার্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করার মাধ্যমে বাণিজ্যের গতি বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে,
ভারতের নিজস্ব আলোচ্যসূচিতে তুলার সুতা ও অন্যান্য নির্দিষ্ট
পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু স্থলবন্দরে বিদ্যমান বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের বিষয়টি রয়েছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা নিরসন, আঞ্চলিক
যোগাযোগের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং বহুমাত্রিক পরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণের বিষয়গুলোও তাদের প্রস্তাবনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিশেষ
করে আখাউড়া-আগরতলা সংযোগসহ সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক রুটগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি, বাংলাদেশ-ভারত রেল যোগাযোগের আধুনিকায়ন এবং সীমান্ত হাট সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও আজকের আলোচনায় স্থান পেয়েছে। পাশাপাশি, স্থলবন্দর, কাস্টমস ও সীমান্ত চেকপোস্টগুলোর
কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়িয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে অপ্রয়োজনীয় সময় ও আর্থিক ব্যয়
হ্রাসের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের
মতে, ভৌগোলিক নৈকট্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের
বিপুল সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বহুগুণ সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনার শতভাগ
সুফল পেতে হলে বাজারে প্রবেশের বড় বাধাগুলো দূর
করার পাশাপাশি সীমান্তে পণ্য পরিবহন ও খালাসের দীর্ঘসূত্রতা
নিরসন করা অত্যন্ত জরুরি। যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের এই ফলপ্রসূ আলোচনার
মাধ্যমেই অদূর ভবিষ্যতে এসব জটিলতার অবসান এবং কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের পথ আরও সুগম
হবে বলে দৃঢ় প্রত্যাশা করা হচ্ছে।