ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬,  ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মিস্টার মোদি, আমরা আপনাকে ঘিরে ফেলছি, পিছু হটব না: তোপ রাহুল গান্ধীর জনস্রোত দেখে আতঙ্কিত মোদি সরকার: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক সঞ্জয় কাপুর এক টাকার মাস্টার লুৎফর রহমান আটটি যুদ্ধ থামিয়েও নোবেল পেলাম না: ট্রাম্পের তীব্র ক্ষোভ আটকের পরও অনড় ইমরান খান, প্রিজন ভ্যান থেকেই পাঠালেন বার্তা ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ৩০০ ছুঁই ছুঁই, ২৪ ঘণ্টায় ৪ জনের মৃত্যু আটকের পর নিখোঁজ সিজেপির শীর্ষ তিন নেতা: তীব্র উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় পরিবার ও দল আগামী সোমবার দিল্লিতে বিরোধী 'ইন্ডিয়া' জোটের বিশাল বিক্ষোভের ডাক! ভারতে চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রীসহ আটক তিন হাজার ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে আরও ৮ জনের মৃত্যু, নতুন রোগী ১০৮৬

এক টাকার মাস্টার লুৎফর রহমান


গাইবান্ধার লুৎফর রহমান

  • আপলোড সময় : শনিবার ১০ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৮:১৭ পিএম

ব্রহ্মপুত্র নদের করাল গ্রাসে ভিটামাটি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া এক মানুষ, যিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন জ্ঞানের প্রদীপ জ্বেলে। তিনি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাগুড়িয়া গ্রামের প্রবীণ লুৎফর রহমান। বয়স প্রায় আট ছুঁই ছুঁই হলেও তাঁর অদম্য মানসিক শক্তি ও শিক্ষার আলো ছড়ানোর স্পৃহা একটুও ম্লান হয়নি। দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে অবহেলিত ও ঝরে পড়া শিশুদের পরম যত্নে বর্ণমালা ও নৈতিকতার পাঠ দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বিনিময়ে কোনো ভারী পারিশ্রমিক বা ফি নয়, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেন মাত্র এক টাকা। এই অনন্য সেবামূলক কাজের সুবাদে তিনি আজ সর্বমহলে সমাদৃত ও পরিচিত ‘এক টাকার মাস্টার’ হিসেবে।


সম্প্রতি তাঁর এই সুদীর্ঘ ত্যাগের স্বীকৃতি মিলেছে রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় পর্যায়ে। গত ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে দেশের একশ গুণী শিক্ষকের সঙ্গে সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। পুরস্কার হিসেবে নগদ দুই লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্রের পাশাপাশি তাঁর জন্য সরকারি অবসরভাতা চালুর ঐতিহাসিক ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর সান্নিধ্যে গিয়ে এই সম্মান গ্রহণের পর তাঁর আনন্দ ও অনুভূতি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। তবে পুরস্কার বা অর্থ তাঁর মূল লক্ষ্য নয়; যতদিন বেঁচে থাকবেন ও সুস্থ থাকবেন, তত দিন শিশুদের পড়িয়ে যাওয়াই তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত।


লুৎফর রহমানের জীবন সংগ্রামের ইতিহাস বেশ বেদনাদায়ক ও করুণ। জন্ম ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামে হলেও প্রমত্তা নদীর নিষ্ঠুর ভাঙন তাঁর পরিবারের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কেড়ে নেয়। চরের শত বিঘার বেশি আবাদি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে একসময় তাঁর পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বিভিন্ন চরে ঘুরে অবশেষে গাইবান্ধা সদরের বাগুড়িয়া গ্রামে তিন শতাংশ জমির ওপর মাথাগোঁজার স্থায়ী ঠাঁই পান। বাবা-মায়ের কনিষ্ঠ এই সন্তান বহু কষ্টে স্কুলজীবন পার করলেও অর্থাভাবে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে পারেননি। নিজের জীবনের সেই বঞ্চনা ও হাহাকার থেকেই তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, অর্থের অভাবে কোনো এলাকার কোনো শিশুর শিক্ষাজীবন যেন কখনো থেমে না যায়।


১৯৭৪ সালের ভয়াবহ অভাব-অনটনের পটভূমিতে তিনি এই মহৎ কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। প্রথম দিকে গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত ও স্কুলছুট শিশুদের বাড়ি থেকে ডেকে এনে পড়াতেন এবং পারিশ্রমিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এক বা দুই মুষ্টি চাল সংগ্রহ করতেন। পরবর্তীতে চাল নেওয়ার প্রথা বদলে প্রতীকী মূল্যের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীপ্রতি মাত্র এক টাকা নির্ধারণ করেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর সহজ স্বীকারোক্তি, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়ালে শিশুদের মধ্যে নিয়মিত পড়াশোনার প্রতি অনীহা তৈরি হতে পারে, আবার দরিদ্র অভিভাবকদের পক্ষেও বড় অঙ্কের ফি দেওয়া অসম্ভব। তাই পড়াশোনার সঙ্গে তাদের নিবিড়ভাবে যুক্ত রাখতেই এই এক টাকার কৌশল আজও তিনি বজায় রেখেছেন।


বর্তমানে বাগুড়িয়া গ্রামের মদনের পাড়ায় নিজ বাড়ির বারান্দায় প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় বসে তাঁর মিনি পাঠশালা। চরের বৈরী আবহাওয়া, প্রবল রোদ-বৃষ্টি কিংবা বার্ধক্যজনিত শারীরিক দুর্বলতা—কোনো কিছুই তাঁকে ঘরে আটকে রাখতে পারেনি। বাইসাইকেলে চড়ে কিংবা হেঁটে নিয়মিত শিখন কার্যক্রমে অংশ নেন তিনি। তাঁর কাছে পড়া অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ সফলতার সঙ্গে শিক্ষকতা, চিকিৎসাসেবা, পুলিশ ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, একসময়ে তাঁর কাছে শিক্ষা নেওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের সন্তানেরাও আজ তাঁরই সামনে বসে পড়াশোনা করছে।


লুৎফর রহমানের এই নিঃস্বার্থ অবদানকে আরও সুদৃঢ় করতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাঁর বাড়িতে ‘এক টাকার স্কুল’ নামে একটি নতুন পাঠশালা নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ দরিদ্র শিশুরা আরও বড় পরিসরে বিনা মূল্যে শিক্ষার সুযোগ পাবে। বার্ধক্যের কোঠায় পৌঁছে রাষ্ট্রীয় সম্মান ও স্থায়ী অবকাঠামোর এই প্রাপ্তি তাঁর দীর্ঘ সাধনার এক দারুণ স্বীকৃতি। তবে লুৎফর রহমানের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো কোমলমতি শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং শিক্ষার আলো ছড়ানোর অবিরাম তৃপ্তি।


এ সম্পর্কিত আরো খবর