ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬,  ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

আইএমএফের কঠিন শর্ত মানবে না সরকার

বিকল্প অর্থায়নের খোঁজে ব্যাংকক সম্মেলনে বাংলাদেশ


  • আপলোড সময় : রবিবার ১১ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৪:২০ পিএম

বিশ্ব অর্থনীতি যখন মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার, বৈশ্বিক ঋণের চাপ ও নানা ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, তখন বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠানি এই বৈশ্বিক সম্মেলন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি ও কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।


থাইল্যান্ডের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত এই বার্ষিক সভায় বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন অর্থায়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাসহ নানা কৌশল নিয়ে বিশ্বনেতারা আলোচনা করবেন। বাংলাদেশের জন্য এই সভা নতুন ঋণ কর্মসূচি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার এক অনন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে। নতুন এই ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফের কাছ থেকে ৪৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি ডলার অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ।


সরকারের নতুন কৌশল ও প্রতিনিধি দল

ব্যাংককের এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় অংশ নিতে বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন। প্রতিনিধি দলে রয়েছেন—

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান

অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সভার সাইডলাইনে আইএমএফের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে একাধিক উচ্চপর্যায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এসব বৈঠকে আগের ঋণ কর্মসূচির অসম্পূর্ণ শর্তসমূহ, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকি কমানোর মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। ব্যাংককের আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জিত হলে চলতি মাসের শেষ দিকে আইএমএফের একটি কারিগরি দল ঢাকা সফর করতে পারে।

আইএমএফের কঠিন শর্তে না এবং বিকল্প অর্থায়ন

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া সংস্কারের পরিবর্তে নিজস্ব বাস্তবসম্মত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছে। সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, আইএমএফের কোনো কঠিন শর্ত মেনে নতুন ঋণ নেওয়া হবে না। বৈদেশিক ঋণদাতা সংস্থার ওপর নির্ভর করে দেশ পরিচালনার গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।


সরকারের যুক্তি হলো, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ কিংবা এডিবি অর্থায়ন করবে আর দেশ পরিচালিত হবে—এই নির্ভরতার চক্র ভাঙতে হবে। উন্নয়ন সহযোগীদের সীমিত তহবিলের ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পুঁজিবাজার থেকে বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের মাধ্যমে বিকল্প অর্থায়নের নতুন কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ঋণের ব্যয়, পরিশোধের সক্ষমতা এবং দেশের সার্বিক ঋণঝুঁকি সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।


ব্যাংকিং খাত ও রাজস্ব সংস্কারের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে বেশ কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান রয়েছে। দুর্বল রাজস্ব আহরণ, খেলাপি ঋণ ও ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বেসরকারি বিনিয়োগে শ্লথগতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতি উত্তরণে সরকার ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।


বিশেষ করে, ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আয় ১০ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এই লক্ষ্য অর্জনে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে ইতিমধ্যেই তিনটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকসহ সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের আস্থার সংকট কাটাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে সরকারের সংস্কার ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

 


এ সম্পর্কিত আরো খবর