ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,  ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
যুব উন্নয়নের নিয়োগে প্রশ্নফাঁস: এনবিআর ও সরকারি দপ্তরের কর্মীসহ গ্রেপ্তার ৭ মোদি সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ বিজেপির বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের চুরি হওয়া আরও ৩ লাখ টাকা উদ্ধার দিল্লিতে ককরোচ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে ফের আটক রাজনৈতিক দুনিয়ায় কাউকে বিশ্বাস করি না: নিউজম্যাক্সে বিস্ফোরক মন্তব্য ট্রাম্পের সেন্ট্রাল পার্কে পতাকা উত্তোলন রুখতে দিল্লিতে হাজার হাজার পুলিশ ঋণের চাপ সামলাতে আর্থিক সংস্কারের তাগিদ আইএমএফের সেন্ট্রাল পার্কে পতাকা উত্তোলনের ডাক: সিজেপি প্রধান দিপকের বাড়িতে দিল্লি পুলিশ আটকের ১৫ ঘণ্টা পর দুই পুলিশকে ফেরত দিলো বিএসএফ শত ব্যস্ততার মাঝেও সাধারণ মানুষের দুয়ারে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম

চলনবিলে মিলছে না মাছ: চরম অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহ্যবাহী শুঁটকিশিল্প


  • আপলোড সময় : শুক্রবার ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ২:৫২ পিএম

রেজাউল ক‌রিম ঝন্টু,  সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ

চলনবিল ছিল একসময় দেশি মাছের প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ। বর্ষা এলেই বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে ছড়িয়ে পড়ত নানা প্রজাতির মাছ। সেই মাছ ঘিরেই গড়ে উঠেছিল সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকিশিল্প। বিলের পুঁটি, খলশে, চেলা, টেংরা, বাতাসি, টাকি, নলা, বাইম ও চিংড়িসহ নানা দেশি মাছ রোদে শুকিয়ে তৈরি হতো সুস্বাদু শুঁটকি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজার পেরিয়ে এই শুঁটকি পৌঁছে যেত বিদেশেও। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে সেই চিত্র। চলনবিলে মাছের সংকট, জলাভূমির সংকোচন এবং প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে এ অঞ্চলের শুঁটকিশিল্প। কমছে উৎপাদন, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক মহাল। অন্যদিকে দেশীয় শুঁটকির ঘাটতি পূরণে বাড়ছে ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে আমদানির ওপর নির্ভরতা।

মাছের অভাবে একসময়ের কর্মচঞ্চল শুঁটকিমহালগুলোতে এখন নেমে এসেছে স্থবিরতা। কোথাও সীমিত পরিসরে চলছে উৎপাদন, কোথাও আবার প্রয়োজনীয় কাঁচা মাছের অভাবে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে শুধু ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, কাজ হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ছেন হাজারো শ্রমজীবী মানুষ। বিশেষ করে শুঁটকি তৈরির কাজে যুক্ত নারী শ্রমিকদের জীবিকা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সিরাজগঞ্জের চলনবিল অধ্যুষিত উল্লাপাড়া ও তাড়াশ উপজেলার ৬০টি শুঁটকিমহালে মোট ৩০২ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল। ওই শুঁটকির বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৮ কোটি টাকা। কিন্তু পরের অর্থবছরেই উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুঁটকির উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ১৮৫ দশমিক ১৭ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ১১৬ দশমিক ৮৩ মেট্রিক টন বা ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, চলতি মৌসুমে চলনবিলে মাছের সরবরাহ আরও কম থাকায় উৎপাদন পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জে বছরে মোট মাছের উৎপাদন ৭৮ হাজার ৯৪৫ দশমিক ১৪ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চলনবিলের অংশ হিসেবে উল্লাপাড়া ও তাড়াশ উপজেলায় উৎপাদিত হয় ৫ হাজার ২৩০ দশমিক ৭৩ মেট্রিক টন মাছ। তবে এই মাছের সবটুকু শুঁটকি তৈরিতে ব্যবহৃত হয় না। স্থানীয় মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় শুঁটকিশিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহ করাই এখন ব্যবসায়ীদের বড় চ্যালেঞ্জ।


চলনবিলের উল্লাপাড়া উপজেলার আড়ুয়া পাঙ্গাসী গ্রামে একসময় শুঁটকি তৈরির মৌসুমে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য দেখা যেত। গ্রামের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা মহালগুলোতে নারী-পুরুষ মিলেমিশে মাছ পরিষ্কার, বাছাই, শুকানো ও সংরক্ষণের কাজ করতেন। বাঁশের মাচায় সারি সারি মাছ শুকানোর দৃশ্য ছিল এলাকার পরিচিত চিত্র। এখনো সেখানে শুঁটকি তৈরির কাজ চলছে, তবে মাছের সংকটে আগের সেই ব্যস্ততা অনেকটাই কমে গেছে।


মহালগুলোতে সাধারণত পুঁটি, খলশে, চেলা, টেংরা, বাতাসি, চিংড়ি, নলা ও টাকি মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়। এসব মাছের স্বাদ ও গুণগত মানের কারণে চলনবিলের শুঁটকির আলাদা পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় জলাভূমিতে মাছ কমে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ীকে অন্য এলাকা থেকে কাঁচা মাছ কিনে আনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, পাশাপাশি লাভের পরিমাণও কমে যাচ্ছে।


আড়ুয়া পাঙ্গাসী গ্রামের শুঁটকিমহালের মালিক ইউসুফ আলী জানান, শুঁটকি উৎপাদনের এখন ভরা মৌসুম হলেও চলনবিলে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে অন্য এলাকা থেকে কাঁচা মাছ সংগ্রহ করে শুঁটকি তৈরি করতে হচ্ছে। গত বছর তাঁর মহালে প্রায় ৩০ টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল। কিন্তু এবার ১০ টন উৎপাদন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও তিনি সন্দিহান।

তাড়াশ উপজেলার মান্নাননগর এলাকার শুঁটকি ব্যবসায়ী আব্দুস সালামের ভাষ্য, মাছের সংকটে প্রায় ৫০ শতাংশ মহালে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এর ফলে শুঁটকি তৈরির সঙ্গে যুক্ত অন্তত ১০ হাজার শ্রমজীবী মানুষ অর্থসংকটে পড়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। তাঁদের অনেকেই বিকল্প কাজ না পেয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।


দেশীয় শুঁটকির উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারের চাহিদা পূরণে বিদেশ থেকে শুঁটকি আমদানি বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে প্রতি মাসে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার টন শুঁটকি আমদানি করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, দেশের শুঁটকির চাহিদার প্রায় ৫৮ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হচ্ছে।


তবে আমদানি করা শুঁটকির গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ। তাঁদের মতে, চলনবিলের দেশি মাছ থেকে তৈরি শুঁটকির স্বাদ, গন্ধ ও মান তুলনামূলক ভালো। অথচ পর্যাপ্ত উৎপাদন না থাকায় দেশীয় শুঁটকির বাজার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।


শুঁটকি ব্যবসায়ীদের মতে, দেশের বাজারে আমদানিনির্ভরতা বাড়লেও চলনবিলের শুঁটকির চাহিদা এখনো রয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শুঁটকির একটি অংশ বিদেশেও রপ্তানি হয়। ফলে দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া শুধু স্থানীয় অর্থনীতির ক্ষতি করছে না, সম্ভাবনাময় একটি রপ্তানি খাতের বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করছে।


চলনবিলের শুঁটকির বাজার শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, মান ও আকারের ভিত্তিতে শুঁটকি বাছাই করে এ, বি ও সি—এই তিন শ্রেণিতে বিক্রি করা হয়। উন্নত মানের ‘এ’ গ্রেডের শুঁটকি আমেরিকা, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ১০ থেকে ১২টি দেশে রপ্তানি করা হয়। অন্যদিকে ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডের শুঁটকি বিক্রি হয় ঢাকা, সৈয়দপুর, তিস্তা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে।


স্থানীয় ব্যবসায়ী সাচ্চু মন্ডল জানান, চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় মৌসুমভিত্তিক শুঁটকিমহাল বসে। এসব মহালে দেশি মাছ শুকিয়ে বাজারজাত করা হয়। কিন্তু এবার মাছের সরবরাহ কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী শুঁটকি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ফলে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানির ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুঁটকির আকার ও মানভেদে দামেও পার্থক্য রয়েছে। ছোট আকারের মাছের শুঁটকি প্রতি মণ ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং বড় আকারের মাছের শুঁটকি ২২ হাজার থেকে ৩৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। 




এ সম্পর্কিত আরো খবর