ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬,  ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

এআই প্রীতির করুণ পরিণতি: সর্বস্ব বিক্রি করে নিঃস্ব প্রেমিক


  • আপলোড সময় : সোমবার ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৩:৪৪ পিএম

ইন্টারনেটের রঙিন দুনিয়ায় অন্ধ ভালোলাগা বা ভার্চুয়াল মোহ মানুষের জীবনকে কতটা মর্মান্তিক ও করুণ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে, তার এক অবিশ্বাস্য ও হৃদয়বিদারক বাস্তব উদাহরণ দেখা গেল ব্রাজিলে। অনলাইনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর তৈরি একটি কাল্পনিক চরিত্রকে রক্তমাংসের মানুষ ভেবে মন সঁপে দিয়েছিলেন এক নিঃসঙ্গ ব্যক্তি। জীবনের সমস্ত সম্বল ও বসতভিটা বিক্রি করে ১৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যখন তিনি কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসার মানুষের ঠিকানায় পৌঁছালেন, তখন তাঁর চোখের সামনে উন্মোচিত হলো এক নির্মম ও নিষ্ঠুর সত্য। তিনি জানতে পারলেন, যাকে ভালোবেসে তিনি সর্বস্বান্ত হয়েছেন, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্বই নেই!


আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ব্রাজিলের মারানহাও রাজ্যের ৪৯ বয়সি সহজ-সরল রাজমিস্ত্রি এদিমার মার্তিন্স ২০২০ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘জেসিকা অলিভেইরা’ কিংবা ‘জেসিকা ফাজেনদেইরা’ নামের একটি আকর্ষণীয় অ্যাকাউন্টের সন্ধান পান। জীবনের নানা প্রতিকূলতা এবং বিশেষ করে মায়ের মৃত্যুর পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে তিনি তীব্র ও মর্মান্তিক একাকীত্বে ভুগছিলেন। এই চরম নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি পেয়ে নতুন জীবন শুরুর আকুল আশায় এদিমার ওই কাল্পনিক প্রোফাইলের আড়ালে থাকা কোনো নারীর প্রেমে পুরোপুরি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। দীর্ঘ সময় ধরে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সেই কথিত নারীর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, এই নারীই হয়তো তার জীবনের সব অন্ধকার দূর করবে।


অবশেষে সেই মরিয়া আশার বশে গত ৯ অক্টোবর নিজের শেষ সম্বল ও সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে ফেলেন এদিমার মার্তিন্স। সেই বিক্রয়লব্ধ অর্থ সম্বল করে দীর্ঘ ১৯০০ কিলোমিটার পথ বাসযোগে পাড়ি দিয়ে তিনি এসে উপস্থিত হন ব্রাজিলের সুদূর বেলো হরিজোন্তে শহরে। তার সুদৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এই শহরের বুকেই তার স্বপ্নের রাজকন্যা তার জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পরই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বিভীষিকা ও ধাক্কাটি আসে। হাতে থাকা সেই কাল্পনিক ছবি নিয়ে তিনি শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান এবং একপর্যায়ে সাহায্য পাওয়ার আশায় একটি স্থানীয় রেডিও স্টেশনের শরণাপন্ন হন। সেখানে সাংবাদিক ও স্থানীয়দের সহায়তায় খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন যে, যার জন্য তিনি নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করে সুদূর পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন, বাস্তবে সেই নারীর কোনো অস্তিত্বই নেই। অ্যাকাউন্টটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং এটি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রযুক্তির সাহায্যে কেবল সোশ্যাল মিডিয়ায় পেজের এনগেজমেন্ট ও ভিউ বাড়ানোর জন্য তৈরি একটি কাল্পনিক চরিত্র মাত্র।


সবকিছু হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব, প্রতারিত ও দিশেহারা হয়ে পড়া এই ব্যক্তিকে পরবর্তীতে স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন এগিয়ে এসে মানবিক সহায়তা প্রদান করে। তাঁরা এদিমারকে খাবার, গোসলের ব্যবস্থা এবং নিজ বাড়িতে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার জন্য বাসের টিকিটের ব্যবস্থা করে দেন। এদিকে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর উক্ত অ্যাকাউন্টের মূল সৃষ্টিকর্তারা পরবর্তী সময়ে ওই এআই চরিত্র জেসিকার পক্ষ থেকে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। সেই বার্তায় তারা জানান যে, এটি কেবল পেজের রিচ বাড়ানোর জন্য তৈরি একটি এআই চরিত্র মাত্র এবং মার্তিন্সের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত বা বাস্তব কোনো কথা হয়নি।


যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘দ্য সান’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, এই একটিমাত্র এআই পেজের মায়াজালে পা দিয়ে গত মাত্র ছয় মাসের মধ্যে এদিমার মার্তিন্সসহ মোট তিনজন পুরুষ একই ভুল করেছেন। এআই প্রযুক্তির এমন অপব্যবহার এবং ভার্চুয়াল মোহ মানুষের আবেগকে কীভাবে পুঁজি করছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। (সূত্র: দ্য সান, এনডিটিভি)


এ সম্পর্কিত আরো খবর