চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের সুনির্দিষ্ট তারিখ ও স্থান নির্ধারণ নিয়ে রীতিমতো তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তারা কখনো ২৯ অক্টোবর, আবার কখনো ৩১ অক্টোবর ফল প্রকাশের দিনক্ষণ ঘোষণা করেছে। শুধু তারিখই নয়, একেবারে শেষ মুহূর্তে বদলে ফেলা হয়েছে ফল প্রকাশের স্থানও। শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বশীল উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এমন চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও সমন্বয়হীনতায় গভীর ক্ষোভ, বিভ্রান্তি এবং তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের সাধারণ পরীক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকেরা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে দৈনিক ইত্তেফাক এই তথ্য জানিয়েছে।
প্রচলিত প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী, আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি বৈঠকের মাধ্যমে ফল প্রকাশের একটি সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করে প্রাথমিক অনুমোদনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর সূচিসংক্রান্ত বা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশবাসীকে ফল প্রকাশের তারিখ নিশ্চিত করে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি, এবার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় চরম ব্যত্যয় ঘটেছে।
ঘটনার শুরু হয় গত ২৪ অক্টোবর। ওই দিন বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের সই করা এক দাপ্তরিক বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট জানানো হয় যে, আগামী ২৯ অক্টোবর দেশজুড়ে একযোগে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হবে। একই বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ফল প্রকাশের সঠিক সময়সূচি, ডাউনলোডের প্রক্রিয়া এবং শিক্ষার্থীরা কীভাবে ঘরে বসেই দ্রুততম সময়ে ফল দেখতে পারবেন—সে বিষয়ে ২৬ অক্টোবর দ্বিতীয় আরেকটি নির্দেশনামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। কিন্তু নির্ধারিত দিন পার হয়ে গেলেও শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে নতুন কোনো হালনাগাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি, যা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে প্রথম দফায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।
পরবর্তীতে শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পূর্বনির্ধারিত সরকারি সফরে জাপানে অবস্থান করায় ফল প্রকাশের তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা এ-সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রমে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকলেও পুরো বিষয়টিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচনা করছিলেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এই অচলাবস্থার পর গত ২৭ অক্টোবর ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত নতুন বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী ৩১ অক্টোবর এইচএসসির ফল প্রকাশ করা হবে এবং রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে বেলা ১১টায় আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ফল ঘোষণা করা হবে। কিন্তু নাটকীয়তার এখানেই শেষ ছিল না। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ফের একটি সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বোর্ড। সেখানে ফল প্রকাশের স্থান পুনর্নির্ধারণ করে সচিবালয়ে অবস্থিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষকে নির্বাচিত করা হয়। নতুন সময়সূচি অনুযায়ী, সচিবালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশ করবেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
শিক্ষা প্রশাসনের এই বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সার্বিক বিষয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করে বাংলাদেশ অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু গণমাধ্যমকে বলেন, শিক্ষাসংক্রান্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বর্তমান সরকার চরম সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও কোমলমতি পরীক্ষার্থীদের হাঁটু-পানি ভেঙে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয়েছিল। সেটাও ছিল প্রশাসনের চরম সিদ্ধান্তহীনতার ফসল। সরকার চাইলেই সেদিন পরিস্থিতি বিবেচনায় পরীক্ষা স্থগিত করতে পারত। কিন্তু নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বারবার এমন হঠকারী ও পরিবর্তনশীল সিদ্ধান্তের কারণে লাখ লাখ পরীক্ষার্থী ও তাদের স্বজনেরা প্রতিনিয়ত গভীর মানসিক উদ্বেগের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।