ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,  ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষী রাঙ্গুনিয়া পোমরার খাঁ মসজিদ


  • আপলোড সময় : বুধবার ৩০ জুলাই, ২০২৫ সময় : ৯:৪৬ পিএম

রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি  

চট্টগ্রাম শহর  থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে  রাঙ্গুনিয়ার পোমরা ইউনিয়নের শান্তির হাট। শান্তির হাটের শুরুতে চট্টগ্রাম -কাপ্তাই সড়কের পাশ ঘেসে বহু প্রাচীন ঐতিহাসিক পোমরা খাঁ মসজিদ। এই মসজিদে সেই  আদিকাল থেকেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন  এলাকা থেকে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে লোকজন  ছুটে  আসতেন অলৌকিক মসজিদের  ছোঁয়া  পেতে। 

মানত করতেন নিজ কিংবা আপনজনের রোগ ব্যাধি হতে মুক্তি ও আশা  আকাংখার সুফল পেতে। এখনো সে ধারা অব্যাহত  আছে। ব্যাপকভাবে প্রচারিত  আছে এই  মসজিদের  দেয়ালে চুন লেপন করে দিলে যে কোন বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত হওয়া যায়। কারো উপর জুলুমবাজরা অবিচার করলে তার সঠিক বিচার পাওয়া যায় সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে। এ ধরনের নানা বিশ্বাস নিয়ে রাঙ্গুনিয়ার প্রাচীনতম পোমরা খাঁ মসজিদের দেয়ালে চুন লেপন করেন মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ।

প্রতি শুক্রবারে বিভিন্ন মানতে আসা সব ধর্মের মানুষের বিশ্বাসের সম্মিলন ঘটে এই মসজিদে। মুসলমানরা নামাজ পড়তে আসার পাশাপাশি ভিন্ন ধর্মালম্বীরা আসেন দেয়ালে চুন লেপন, ঘটিতে পানি রেখে কিছুক্ষণ পর পান করা, মোমবাতি প্রজ্বলনসহ নানা মানত হাসিলের উদ্দেশ্যে। এই চিত্র শুক্রবারে বেশি হলেও সপ্তাহের প্রতিদিনই দেখা যায়।

পোমরা খাঁ মসজিদ কখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার সঠিক কোন দিনক্ষণ, সাল কারও জানা নেই। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায় প্রায় সাড়ে ৪শ বছর পূর্বে এ মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন জনের বিভিন্ন সময় উল্লেখ করেন এলাকা বাসী। তবে লিপিবদ্ধ কোন সাল কেউ পাননি। জনশ্রুতি  আছে, সে সময়ে সন্ধ্যার পর ওই এলাকায় কেউ যাওয়ার সাহস করত না, এশার নামাজের পর গভীর রাতে এবং ফজরের নামাজে এখানে আল্লাহর মুমিন মুসলমানগণ সাদা পোশাকে নামাজ আদায় করতেন। রাত্রে গায়েবী আযান পড়ত। এমনকি এ মসজিদে পাহাড়ি পথে প্রসিদ্ধ বার আউলিয়াগণ প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে ইবাদত করার জন্য আসতেন। বাঘের পিঠে চড়ে প্রসিদ্ধ জনৈক বুজুর্গ ব্যক্তি এই মসজিদে নামাজের উদ্দেশ্যে আসতেন বলে এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে।

আহছান উল্লাহ ফকির নামে প্রসিদ্ধ একজন বুজুর্গ ব্যক্তি এই মসজিদের পাশের কবরস্থানে শায়িত আছেন। যাকে ইন্তেকালের ৬ মাস

পরেও মসজিদে ইবাদত করতে দেখা যেতো বলে প্রবীণ মুসল্লিরা জানান। এরকম এই মসজিদের চারপাশে অনেক কামেল বুজুর্গ ব্যক্তিদের কবর আছে বলে এটির আরেক নাম বুজুর্গ মসজিদ। এখনো শত শত লোক বিভিন্ন নিয়তে এই মসজিদে ভিড় করতে দেখা যায়। এই মসজিদে বিভিন্ন নিয়তে ও মানত করে আসা মানুষ আশানুরূপ সফলতা অর্জন করে বলে জানা গেছে।

 পোমরা খাঁ মসজিদ কমপ্লেক্স পরিচালনা কমিটির বর্তমান সাধারণ  সম্পাদক মোহম্মদ  ইকবাল হোসেন   জানান, খাঁ বংশের জনৈক ব্যক্তি এই এলাকায় আসেন। তিনি পোমরা এইস্থানে পুকুর পাড়ে মসজিদ স্থাপন করার উদ্যোগ নেন। এই উদ্দেশ্যে মাটিও ভরাট করেছিলেন। এসময় বেশ কয়েকদিন ধরে তিনি গায়েবী আজানের ধ্বনি শুনতে পেয়ে বর্তমান খাঁ মসজিদের স্থানে পাহাড়ি ঝোঁপঝাড় পরিষ্কার করে একটি মসজিদ আকৃতির মাটির স্থাপনা দেখতে পান। পরবর্তীতে এই স্থানেই মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পরবর্তী সে সময় থেকে খাঁ মসজিদের  পরিধি ক্রমান্বয়ে বেড়ে এখন দুই কানি (৮০ শতাংশ)  জমিতে নবরূপে  সজ্জিত  খাঁ মসজিদ। নতুন মসজিদ ভবন, মহিলাদের জন্য  আলাদা নামাজ আদায় ও বিশ্রামাগার ঘর, এতিমখানা, হেফজাখানা ঘরের জমি আলাদাভাবে ক্রয় করে নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদ পুকুরের  চারপাশে ধারকদেয়াল নির্মাণ এবং যাতায়াত  সুবিধার জন্য সড়ক পাকাকরনের কাজ শুরু  হয়েছে বলে জানান  পরিচালনা কমিটির বর্তমান  সাধারণ সম্পাদক।

 মসজিদ  পরিচাননা কমিটির সাবেক সহসভাপতি জাহিদুল ইসলাম চৌধুরী আয়ুব জানান, এই মসজিদের জন্য কখনোই  সরকারি  অনুদানের প্রয়োজন পড়েনি। যে যার সাধ্যমত দান করেছে, তাতেই ধীরে ধীরে  উন্নয়নের কাজ এগিয়ে  চলছে।  আরো অনেক ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ করে গরিব ও এতিমদের জন্য বিনামূল্যে  উচ্চ শিক্ষার প্রকল্প  বাস্তবায়ন করার লক্ষ্য  রয়েছে।

 খাঁ মসজিদের খতিব মাওলানা জরিফ আলী আরমানী জানান, তিনি দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে এই মসজিদের খতিবের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিদিন শত শত মানুষ এই মসজিদে আসেন নামাজ আদায় ও মানত পালনে। মূলতঃ ভক্ত ও মানতকারীদের  দান অনুদানের  টাকায় এই মসজিদ ও কমপ্লেক্স  পরিচালিত  হয়ে আসছে।

  Tags :


এ সম্পর্কিত আরো খবর