ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,  ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শিবগঞ্জে ২০০ বছরের ঐতিহ্য—নবান্নে জমজমাট মাছের মেলা


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ১৮ নভেম্বর, ২০২৫ সময় : ৫:২৫ পিএম

শিবগঞ্জ (বগুড়া) প্রতিনিধি:

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার উথলী বাজারে নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়েছে শতাধিক বছরের ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে মঙ্গলবার ছিল অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নবান্ন উৎসব উপলক্ষে এলাকায় আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয়। আর এই উৎসবকে কেন্দ্র করেই প্রতিবছর উথলী বাজারে বসে বড় মাছের মেলা। এদিন নতুন ধানের ভাত ও বিভিন্ন সবজি দিয়ে মাছের নানা পদ রান্না করে জামাই-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজনদের আপ্যায়নের প্রচলন রয়েছে সনাতনী পরিবারে।

মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) ভোর থেকেই বগুড়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা ভিড় জমাতে থাকেন উথলী বাজারে। আয়োজকদের দাবি, এক দিনে এখানকার মেলায় কোটি টাকারও বেশি মাছ বিক্রি হবে। ইজারাদারদের তথ্য অনুযায়ী, এবারের মেলায় দেড় থেকে দুই হাজার মন মাছ উঠেছে। দুই কেজি থেকে শুরু করে ২০ কেজি ওজনের চিতল, রুই, কাতলা, ব্ল্যাক কার্প, সিলভার কার্প, তেলাপিয়া, পাঙ্গাসসহ নানা জাতের মাছ বিক্রি হচ্ছে।

তবে গত বছরের তুলনায় এবারের মেলায় মাছের দাম কিছুটা বেড়েছে। রুই ও কাতলা ৫৫০ থেকে ৮৫০ টাকা কেজি দরে, ব্ল্যাক কার্প, ব্রিগেড ও সিলভার কার্প ৩৫০ থেকে ৭৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

স্থানীয় প্রবীণরা জানান, এই মাছের মেলার ইতিহাস শত শত বছরের পুরোনো। সনাতনী পঞ্জিকা অনুযায়ী পহেলা অগ্রহায়ণকে ঘিরে শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই নয়, মুসলিমসহ সবধরনের মানুষ নবান্ন উৎসব পালন করেন। নতুন ফসল ঘরে তোলা এবং মৌসুমের আনন্দ ভাগাভাগি করার মাধ্যম হিসেবে এই মেলা বহু বছর ধরে এলাকায় সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে। মেলায় শুধু মাছ নয়—নতুন আলু, বিভিন্ন সবজি, মিষ্টান্ন, মাংস, মাটির পণ্য, মুড়ি, মুরকি, চিড়া, জিলাপি, গুড়, নারকেল, আচার, ফলমূল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দোকানও বসেছে।

মেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের ২০ গ্রামের ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। প্রতিটি বাড়ি আত্মীয়-স্বজন, মেয়ে-জামাই, নাতি-নাতনি ও অতিথিদের আগমনে মুখর হয়ে উঠেছে। অনেক বাড়িতে শীতের পিঠাপুলি তৈরি করা হচ্ছে।

উথলী গ্রামের বাসিন্দা বকুল খলিফা বলেন, “আমি দাদার কাছ থেকে শুনেছি এই মেলা প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। রাত ১২টার পর থেকেই মেলা শুরু হয়, তবে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সবচেয়ে জমজমাট থাকে।”

দোলন প্রামাণিক বলেন, “নবান্ন উপলক্ষে এখানে মেলা বসে। এটি আমাদের এলাকাবাসীর সম্প্রীতির প্রতীক। বাড়ি-ঘর আত্মীয়স্বজনের আগমনে মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে, তাদের জন্যই বড় মাছ কিনতে এসেছি।”

স্থানীয়রা জানান, উথলী, শিবগঞ্জ, আমতলী, রথবাড়ি, ছোট-বড় নারায়ণপুর, ধোন্দাকোলা, সাদল্যাপুর, বেড়াবালা, আকন্দপাড়া, গরীবপুর, দেবীপুর, আলাদীপুর, ভাগকোলা, জাবারিপুর, গুজিয়া, মেদনীপাড়া, বাকশন, রহবল, মোকামতলা, গণেশপুর, লক্ষ্মীকোলা—এসব গ্রামের প্রতিটি ঘরে নবান্ন উৎসব কেন্দ্র করে আনন্দঘন পরিবেশ বিরাজ করছে। মাছ ব্যবসায়ী নিতাই দাস বলেন, “নাটোরের সিংড়া এলাকা থেকে প্রায় ৫০ মন মাছ এনেছি। প্রতিটি মাছ দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।”

জয়পুরহাটের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, “মেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক মাছের দোকান বসেছে। প্রত্যেকে পাঁচ থেকে ১০ মন করে মাছ বিক্রি করছেন।” আরেক ব্যবসায়ী শাহিন বলেন, “এবার পাইকারি ও খুচরা—দুই বাজারেই মাছের দাম ভালো। সব ব্যবসায়ীই আশানুরূপ লাভে খুশি।”

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর