রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভারত সফর প্রতীকী ও কূটনৈতিকভাবে উচ্চমাত্রার ছিল। নয়াদিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে তার সম্মানে আয়োজন করা হয় লালগালিচা, ২১ তোপের সালামি, মোদির আলিঙ্গন এবং রাষ্ট্রপতি ভবনের রাষ্ট্রীয় ভোজ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্বের একঘরে করার চেষ্টা শুরুর মধ্যে এই সংবর্ধনা পুতিনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হলো।
তবে বাস্তবে দুই দেশের মধ্যে বড় চুক্তি কম হয়েছে। সফরে প্রধানত ‘বিশেষ ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কৌশলগত অংশীদারত্ব’ বজায় রাখার বিষয়ে কয়েকটি সমঝোতা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাশিয়া-ভারত অর্থনৈতিক সহযোগিতা কর্মসূচি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও সাপ্লাই চেইন সংক্রান্ত সমঝোতা এবং রাশিয়ার কালুগা অঞ্চলে একটি যৌথ ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানা নির্মাণের ঘোষণা।
পুতিন জানিয়েছিলেন, রাশিয়া ভারতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ করতে প্রস্তুত। তবে নতুন কোনো পরিমাণ বা শর্তের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্কের চাপের কারণে ভারত রাশিয়ার তেল আমদানি কিছুটা কমিয়েছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বড় চুক্তি হয়নি। এসইউ-৫৭ যুদ্ধবিমান কেনা বা অতিরিক্ত এস-৪০০ ডেলিভারি সংক্রান্ত কোনো ঘোষণা আসেনি।
পুতিনের পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, মোদি-পুতিন বৈঠক সফরের মূল অংশ ছিল। মুখোমুখি আলোচনা চলাকালীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে স্পর্শকাতর আলোচনা হয়েছে।
দিল্লি বিমানবন্দরে মোদির আলিঙ্গনে পুতিনকে স্বাগত জানানো এবং রাষ্ট্রপতি ভবনের উষ্ণ সংবর্ধনা ভারতের রাশিয়ার প্রতি দীর্ঘমেয়াদি আস্থার প্রকাশ। তবে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন বড় চুক্তিতে রূপ নেনি। সফরের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাণিজ্য। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কে চাপের মধ্যে থাকা ভারত দুই দেশই বিকল্প বাজার খুঁজছে।
বর্তমান বাণিজ্য ৬৮.৭২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২০ সালের ৮.১ বিলিয়ন ডলার থেকে দ্রুত বেড়েছে। মূলত রাশিয়ার ডিসকাউন্টেড তেল কেনার কারণে এটি সম্ভব হয়েছে। দুই দেশ ১০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য লক্ষ্য ধরে পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক কাঠামোতে সই করেছে। এছাড়া জাহাজ নির্মাণ, নাবিক প্রশিক্ষণ, নতুন শিপিং লেন, অসামরিক পারমাণবিক জ্বালানি, ভিসামুক্ত ভ্রমণ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে সমঝোতা হয়েছে।
মোদি ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়ন (ইএইইউ)–এর সঙ্গে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতি উল্লেখ করেছেন। এ চুক্তি হলে রাশিয়া-ভারতসহ সদস্য দেশগুলো নতুন বাজারে প্রবেশাধিকার পাবে।
প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারতের জন্য রাশিয়ার প্রভাব অটুট রয়েছে। চলমান প্রতিরক্ষা প্রকল্পের সময়মতো সরবরাহ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটের ডেলিভারি দেরি রয়েছে, যা দ্রুত সরবরাহের নিশ্চয়তা পেতে ভারত আগ্রহী।
সারসংক্ষেপে, পুতিন পশ্চিমার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতীকী জয় পেয়েছেন, আর মোদি বিকল্প বাজার ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু তেল এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ে নতুন কোনো বড় চুক্তি হয়নি।
আকাশজমিন / আরআর