অনলাইন রিপোর্টার
প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহার করে জনকল্যাণমূলক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি চর্চার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য যে কোনো মূল্যে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক হলেও তা যেন বিভেদের কারণ না হয়, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে তিনি দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতন্ত্র, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন এবং বিএনপির সম্ভাব্য নীতিগত পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন।
বক্তব্যের শুরুতেই তারেক রহমান দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে তাদের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়লে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে কার্যকরভাবে চালু করা।
তিনি বলেন, হিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির পরিণতি কী হতে পারে, তা আমরা সবাই দেখেছি চব্বিশের ৫ আগস্ট। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে আর কোনো প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধের রাজনীতি তিনি দেখতে চান না বলেও স্পষ্ট করে জানান।
তারেক রহমান বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই, সেটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তবে মতপার্থক্য যেন মতবিভেদে রূপ না নেয় এবং বিভেদের কারণ না হয়, সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মতভিন্নতা দূর করে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখাই সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, অতীতে বিভেদের রাজনীতি জাতিকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তার অভিজ্ঞতা সবারই জানা। বিভাজনের রাজনীতি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তাই ভবিষ্যতে রাজনীতিবিদদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
তারেক রহমান আরও বলেন, আমাদের সমস্যা ছিল, সমস্যা আছে। তবে আমরা অবশ্যই ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাই না। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। দেশের মানুষ পরিবর্তন চায় এবং সেই পরিবর্তন আনতে হলে দায়িত্বশীল ও মানবিক রাজনীতির বিকল্প নেই।
নিজের রাজনৈতিক অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী। রাজনীতি করি জনগণের জন্য। আগামী ২২ তারিখ থেকে আমাদের সব নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা নিয়ে জনগণের কাছে যাবো। জনগণের মতামত শুনবো, তাদের কথা জানবো এবং সেই অনুযায়ী আমাদের কর্মসূচি সাজানো হবে।
অনুষ্ঠানে তারেক রহমান দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রস্তাবও তুলে ধরেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের জন্য একটি যুগান্তকারী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রস্তাব।
তিনি বলেন, এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মূল কেন্দ্রে থাকবেন পরিবারের গৃহিণীরা। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের গৃহিণী ৫ থেকে ৭ বছর আর্থিক বা খাদ্য সহায়তা পাবেন। এর ফলে পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার হবে।
তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের হাতে অর্থ থাকলে তা মূলত স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগে ব্যয় হয়। এতে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজ ও স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। তাই এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি আরও মজবুত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও জানান, এই সুবিধা হবে সর্বজনীন। কোনো দলীয় পরিচয় বা শ্রেণিবিভাগের কারণে যেন কেউ বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। এতে করে দুর্নীতি বা বৈষম্যের সুযোগ থাকবে না।
স্বাস্থ্যখাত প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বের আদলে ‘প্রিভেনশন’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে। মানুষ যেন অসুস্থ হওয়ার আগেই সচেতন হয়, সেটাই হবে এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।
তিনি জানান, এই লক্ষ্যে প্রায় ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এই স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ হবেন নারী। তারা ঘরে ঘরে গিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবেন।
তারেক রহমান বলেন, এর ফলে একদিকে জনস্বাস্থ্য উন্নত হবে, অন্যদিকে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলে যাবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিভিন্ন গণমাধ্যম ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। আপনারা এমন সমালোচনা করুন, যাতে আমরা দেশের জনগণের প্রকৃত সমস্যা সমাধান করতে পারি। গঠনমূলক সমালোচনাই রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে সঠিক পথে এগিয়ে নেয়।
অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে।
আকাশজমিন / আরআর