সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 167
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের পাশে দূরপাল্লার পণ্যবাহী ট্রাকচালকদের জন্য ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক ট্রাক টার্মিনাল ও চালক বিশ্রামাগার ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো চালু হয়নি। ফলে চালকদের কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়া এই স্থাপনাটি বর্তমানে স্থানীয়দের ধান শুকানো ও গরু রাখার জায়গায় পরিণত হয়েছে। রাতের আঁধারে এটি মাদকসেবীদের নিরাপদ আস্তানায় রূপ নিয়েছে।
এটিকে টেকসই ও নিরাপদ মহাসড়কের অংশ হিসেবে যমুনা সেতুর পশ্চিমে চারটি মহাসড়কের পাশে দূরপাল্লার পণ্যবাহী ট্রাকচালকদের জন্য বিশ্রামাগার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল সড়ক বিভাগ। এর অংশ হিসেবে উল্লাপাড়ার পাঁচলিয়া এলাকায় ২০২০ সালে প্রায় ১৩ একর জায়গার ওপর নির্মাণ করা হয় এই আধুনিক ট্রাক টার্মিনাল।
প্রাথমিকভাবে এর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। পরবর্তীতে প্রকল্পের কিছু কাজ বর্ধিত করার জন্য আরও ১২ কোটি ২০ লাখ টাকা যোগ করে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৫৫ কোটি টাকা।
টার্মিনালটির লক্ষ্য ছিল দূরপাল্লার ট্রাকচালকদের জন্য আধুনিক ও সম্পূর্ণ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। এর মধ্যে অন্যতম ছিল একসঙ্গে ১০০টি ট্রাক পার্কিংয়ের ব্যবস্থা, চালকদের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শয়নকক্ষ (ডরমিটরি), ক্যান্টিন, গোসলখানা, নামাজের জায়গা, প্রাথমিক চিকিৎসা সেবাকক্ষ, যানবাহনের ত্রুটি মেরামতের জন্য ওয়ার্কশপ ও ওয়াশজোন। তবে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এই সুবিধাগুলো চালু হয়নি। ফলে হাজার হাজার ট্রাকচালক এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী ট্রাকচালক আবু বকর আলী জানান, দীর্ঘ পথ গাড়ি চালিয়ে আসার পর শরীর খারাপ লাগলেও বিশ্রামাগারের অভাবে তারা রাস্তার ধারে কিংবা হোটেলের সামনে ট্রাক রেখে বিশ্রাম নিতে বাধ্য হন। এতে অনেক সময় চুরি-ছিনতাই ও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়।
চট্টগ্রাম থেকে আসা ট্রাকচালক বকুল আলী বলেন, "মহাসড়কের পাশে এই বিশ্রামাগারটি দেখতে পাই, কিন্তু এটি চালু না হওয়ায় আমরা এর কোনো সুবিধা নিতে পারছি না। এটি সময়ের সঙ্গে অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে যাচ্ছে।"
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দিনের বেলায় টার্মিনালের সামনের অংশে স্থানীয়রা ধান ও খড় শুকানো এবং গরু-ছাগল রাখার কাজ করেন। আর সন্ধ্যা নামলেই এটি মাদকসেবীদের নিরাপদ আস্তানায় রূপ নেয়। টার্মিনালের ভেতরে কোনো নিরাপত্তা কর্মী বা তত্ত্বাবধায়ক না থাকায় মাদকসেবীরা অবাধে যাতায়াত করে থাকে।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকার ফলে ভবনের বিভিন্ন কক্ষ থেকে দরজা-জানালা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়ে যাচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইমরান ফারহান সুমেল বলেন, "শিগগিরই ইজারা পদ্ধতির মাধ্যমে এই ট্রাক টার্মিনাল চালুর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। চালকদের সুবিধার কথা চিন্তা করে দ্রুত এটির কার্যক্রম শুরু করা হবে।" তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, প্রকল্পের প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় ৪২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ছিল, যা পরে বর্ধিত হয়ে ৫৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইসমাইল হোসেন বলেন, "থানা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। অপরাধ প্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে অপরাধ নির্মূলের চেষ্টা চলছে। মহাসড়কের যানজট নিরসনেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।"
স্থানীয় জনগণ এবং পরিবহন শ্রমিক নেতারা অবিলম্বে এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি চালু করার দাবি জানিয়েছে। তারা চান, দ্রুত ট্রাকচালকদের দুর্ভোগ লাঘব হোক এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হোক।
এমন গুরুত্বপূর্ণ ট্রাক টার্মিনাল দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকার কারণে ট্রাকচালকদের নিরাপদ বিশ্রামের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া, অব্যবহৃত ভবনের অবনতি, নিরাপত্তার অভাব ও মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হওয়া সিরাজগঞ্জের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি উদ্যোগে নির্মিত এই স্থাপনাটি সুষ্ঠু ও সময়োপযোগী ব্যবহারের মাধ্যমে ট্রাকচালকদের জীবনযাত্রা ও কাজের মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আকাশজমিন / আরআর