নতুন গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে যে প্রাণের উৎপত্তির জন্য প্রয়োজনীয় জটিল অণুগুলো মহাকাশে প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হতে পারে। এই আবিষ্কারটি বিভিন্ন গ্রহে জীবনের সম্ভাবনার ওপর নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচন করেছে।
ল্যাবরেটরিতে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, মহাকাশের তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বা আয়োনাইজিং রেডিয়েশন অ্যামিনো অ্যাসিডগুলোকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করে ‘পেপটাইড বন্ড’ তৈরি করতে সাহায্য করে। পেপটাইড বন্ড প্রোটিনের ক্ষুদ্রতম একক অ্যামিনো অ্যাসিডকে সংযুক্ত করে জটিল প্রোটিন তৈরি করার প্রথম ধাপ।
গবেষণার প্রধান লেখক, ডেনমার্কের আরহাস ইউনিভার্সিটির পোস্টডক্টরাল গবেষক আলফ্রেড হপকিনসন জানান, এটি প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে নতুন গবেষণার দরজা খুলেছে। এর মাধ্যমে ভিনগ্রহে জীবনের সন্ধানে বিজ্ঞানীরা আরও নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারবেন।
পৃথিবীর প্রাথমিক পর্যায়ে অ্যামিনো অ্যাসিড, সাধারণ শর্করা ও আরএনএ’র মতো প্রিবায়োটিক অণুর সংমিশ্রণ থেকে প্রাণের বিকাশ ঘটেছিল। তবে এই উপাদানগুলো প্রথম কোথা থেকে এসেছে তা এখনও রহস্য। হপকিনসন বলেন, “প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, কিছু অণু মহাকাশে তৈরি হয়ে উল্কাপাতের মাধ্যমে পৃথিবীতে এসেছে।”
গত ৫০ বছরে উল্কাপিণ্ডের নমুনায় গ্লাইসিন শনাক্ত করা হয়েছে। নাসার ‘ওসাইরিস-রেক্স’ মিশনের মাধ্যমে গ্রহাণু বেনু থেকে সংগৃহীত ধূলিকণাতেও গ্লাইসিন পাওয়া গেছে। তবে দুটি অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে তৈরি ‘ডাইপেপটাইড’ এখনও মহাকাশে পাওয়া যায়নি। তেজস্ক্রিয় পরিবেশের তীব্রতা ডাইপেপটাইড তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
গবেষকরা ল্যাবরেটরিতে মহাকাশের পরিবেশ অনুকরণ করেছেন। হাঙ্গেরির ‘হান-রেন অ্যাটমকি সাইক্লোট্রন’ ফ্যাসিলিটিতে গ্লাইসিন প্রলেপ দেওয়া বরফ কণার ওপর উচ্চ-শক্তির প্রোটন কণা নিক্ষেপ করা হয়। পরীক্ষা ২০ কেলভিন তাপমাত্রা এবং ১০-৯ মিলিবার চাপে চালানো হয়। ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি ও মাস স্পেকট্রোমেট্রির মাধ্যমে উৎপন্ন অণুগুলোর গঠন বিশ্লেষণ করা হয়।
ডিউটেরিয়াম লেবেলিং পদ্ধতির মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে যে গ্লাইসিন অণুগুলো পরস্পরের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ‘গ্লাইসিলগ্লাইসিন’ নামক ডাইপেপটাইড তৈরি করেছে। এছাড়া আরও জটিল অণু শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ‘এন-ফরমাইলগ্লাইসিনামাইড’ রয়েছে। এটি এমন এনজাইমের অংশ যা ডিএনএ গঠনে ভূমিকা রাখে।
হপকিনসন বলেন, “এভাবে মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হলে, প্রাণের উৎপত্তিতে তার প্রভাব বিশাল হতে পারে। এটি আদি পৃথিবী ও ভিনগ্রহে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণার নতুন দিক উন্মোচন করেছে।”
গবেষক দল এখন খতিয়ে দেখছে, মহাকাশে অন্যান্য অ্যামিনো অ্যাসিডও একইভাবে জটিল পেপটাইড তৈরি করতে পারে কি না। সফল হলে, মহাকাশে আরও বৈচিত্র্যময় জৈব অণু তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।