বিএনপি রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ আসন নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০৯ আসনে জয়ের পর দলটি চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে। এ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই দায়িত্ব নিচ্ছেন—এ বিষয়টি এখন কার্যত নিশ্চিত। তবে তাঁর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার আকার কত বড় হবে, কারা মন্ত্রী হচ্ছেন এবং কোন কোন খাতে কাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে—এসব নিয়ে দলীয় অভ্যন্তরে চলছে বিস্তর আলোচনা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা প্রবীণ ও নবীনের সমন্বয়ে গঠিত হবে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের অভিজ্ঞ মন্ত্রীদের যেমন অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে, তেমনি প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া তরুণ ও নতুন মুখদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও পেশাজীবী প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক মন্ত্রিসভা গঠনের চিন্তাভাবনা চলছে।
মন্ত্রিসভার আকার ও কাঠামো নিয়ে আজ রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে কে কোন মন্ত্রণালয় পেতে পারেন, কোন খাতে টেকনোক্র্যাট রাখা হবে এবং উপদেষ্টা পরিষদের কাঠামো কেমন হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
দলীয় সূত্র বলছে, আগামী দিনের মন্ত্রিসভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আবদুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনের নামও আলোচনায় রয়েছে। এঁদের অনেকেই অতীতে মন্ত্রী ছিলেন অথবা দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে।
টেকনোক্র্যাট কোটায় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সেলিমা রহমানকে রাখা হতে পারে বলে জানা গেছে। ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদের নামও আলোচনায় আছে।
নবীনদের মধ্যে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আসাদ ও ব্যারিস্টার কায়সার কামালসহ আরও কয়েকজন নতুন মুখ মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন। টেকনোক্র্যাট কোটায় দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ আলমগীর পাভেলের নামও শোনা যাচ্ছে।
চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় বসতে যাওয়া বিএনপি জোটের সামনে বড় প্রশ্ন—যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের কতটা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। নির্বাচনের আগে ও পরে যে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সেটিকে কতটা সরকার কাঠামোর অংশ করা হবে—এটি এখনো স্পষ্ট নয়। দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করলে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের মধ্য থেকেও কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় রাখা হতে পারে।
যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গীদের মধ্যে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের নাম আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)র চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, এনডিএম থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজ, বাংলাদেশ এলডিপি বিলুপ্ত করে বিএনপিতে আসা শাহাদাত হোসেন সেলিম এবং নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দেওয়া সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এম এস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়ার নামও সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে।
তবে সব শরিক দলকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে কিনা, নাকি শুধুমাত্র নির্বাচনী জোটে থাকা দলগুলো থেকে প্রতিনিধি নেওয়া হবে—সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
মন্ত্রিসভার বাইরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী ও সেক্টরভিত্তিক বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদেরও নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। অর্থনীতি, পররাষ্ট্র, তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আলাদা করে দক্ষ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির চিন্তা রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, নতুন মন্ত্রিসভা কেমন হবে তা জানতে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে একটি কার্যকর, দক্ষ ও প্রতিনিধিত্বমূলক মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্ত্রিসভা হবে বিএনপির জন্য একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র। দীর্ঘদিন পর পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে দলটি। ফলে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক সংস্কার—সব ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
এখন সবার নজর স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্তের দিকে। কে পাচ্ছেন কোন দায়িত্ব—তা জানা গেলে নতুন সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার ও কৌশল অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে।