সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 35
রেজাউল করিম ঝন্টু, সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার উলিপুর গ্রাম এখন পরিচিতি পেয়েছে ‘পাখির গ্রাম’ হিসেবে। প্রায় ৫২ বিঘা আয়তনের একটি দিঘিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই গ্রামে দিন শুরু হয় পাখির কলকাকলিতে। তবে অন্য সব পাখিকে ছাপিয়ে বর্তমানে উলিপুরের সবচেয়ে পরিচিত বাসিন্দা হয়ে উঠেছে শামুকখোল। গ্রামের বড় বড় গাছের ডালে ডালে তাদের বাসা, ছানা আর অবিরাম আনাগোনায় তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক প্রাকৃতিক পরিবেশ।
সকাল হলেই গ্রামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভেসে আসে পাখির ডাক। এক গাছ থেকে আরেক গাছে উড়ে বেড়ায় ঝাঁকে ঝাঁকে শামুকখোল। কোথাও ডানার ঝাপটা, কোথাও আবার পাখির কিচিরমিচির শব্দ। গাছের নিচে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে ডালে বসে থাকা সাদা-ধূসর রঙের অসংখ্য পাখি। একই সঙ্গে দেখা যায় তাদের তৈরি বাসা এবং ছানাদের আনাগোনা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগ পর্যন্ত এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। ফলে পুরো গ্রামজুড়েই বিরাজ করে পাখির কোলাহল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় এক দশক আগে উলিপুর দিঘির পাড়ের কয়েকটি বড় গাছে শতাধিক শামুকখোল আশ্রয় নেয়। তখন তাদের সঙ্গে বালিহাঁস, পানকৌড়ি, মাছরাঙাসহ আরও কয়েক প্রজাতির পাখিও ছিল। দিনের বেলায় এসব পাখি আশপাশের বিল, জলাশয় ও কৃষিজমিতে খাবারের সন্ধানে বের হতো। খাবার সংগ্রহ শেষে সন্ধ্যার দিকে আবার দিঘির পাড়ের গাছগুলোতে ফিরে আসত।
নিরাপদ পরিবেশ ও পর্যাপ্ত খাবারের কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শামুকখোলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে গ্রামের বড় বড় গাছগুলোতে তারা স্থায়ীভাবে বাসা তৈরি শুরু করে। বট, পাকুড়, তেঁতুল, কড়ই ও মেহগনিসহ বিভিন্ন গাছে বাসা বাঁধে পাখিগুলো। সেখানে ডিম পাড়ার পর ডিমে তা দিয়ে নতুন ছানার জন্ম হয়। এভাবেই কয়েক বছরের ব্যবধানে শামুকখোলের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বর্তমানে উলিপুরের অনেক বড় গাছই যেন শামুকখোলের স্থায়ী আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
শামুকখোল সারসজাতীয় বড় জলচর পাখি। এটি সারস পরিবারের সদস্য। শামুকখোলের বৈজ্ঞানিক নাম ‘অ্যানাস্টোমাস অসিটানস’। ইংরেজিতে পাখিটি ‘এশিয়ান ওপেনবিল’ নামে পরিচিত। ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ পাখির বিস্তৃতি রয়েছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন বিল, হাওর, জলাভূমি ও কৃষিজমিতে শামুকখোলের দেখা মেলে। খাবার ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে এরা এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলাচল করে। তবে শামুকখোলকে বাংলাদেশের সাধারণ পরিযায়ী পাখি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। বাংলাদেশ বন বিভাগের পাখির লাল তালিকায় এটিকে ‘সাধারণ আবাসিক পাখি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শামুকখোলের শারীরিক গঠনও বেশ আকর্ষণীয়। এর দেহের বেশির ভাগ অংশ সাদা বা ধূসর হলেও পাখা ও লেজের শেষাংশ কালো। লম্বা পা সাধারণত গোলাপি বা লালচে রঙের হয়। শামুক, ঝিনুক, ছোট মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙ, বিভিন্ন জলজ প্রাণী এবং নানা ধরনের পোকামাকড় খেয়ে এরা জীবনধারণ করে। চলনবিলের বিস্তৃত জলাভূমি শামুকখোলের জন্য খাবারের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করছে। বর্ষাকালে বিল, ডোবা-নালা ও বিভিন্ন জলাশয়ে পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া যায়। ফলে খাবারের সন্ধানে পাখিগুলোকে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। দিনের খাবার সংগ্রহ শেষে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে তারা আবার ফিরে আসে উলিপুরের গাছগুলোতে।
উলিপুরে শামুকখোলের নিরাপদ আবাস গড়ে ওঠার পেছনে স্থানীয় মানুষের ভূমিকা রয়েছে বলে জানান গ্রামবাসীরা। উলিপুরের গৃহবধূ নাসরিন সুলতানা বৃষ্টি (২৮) জানান, বিয়ের পর প্রায় ৯ বছর ধরে তিনি এই গ্রামে বসবাস করছেন। শুরুতে শামুকখোলের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও গত পাঁচ-ছয় বছরে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রামে কেউ পাখি শিকার করে না। পাখির দিকে ঢিলও ছোড়া হয় না। কোনো ছানা বাসা থেকে পড়ে গেলে গ্রামের মানুষ সেটিকে তুলে আবার বাসায় রেখে দেয়।’
স্কুলশিক্ষক বাবুল আকতার বলেন, প্রথম দিকে গ্রামে শামুকখোলের সংখ্যা বেশি ছিল না। গত কয়েক বছরে পাখিটির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে গ্রামের অধিকাংশ বড় গাছেই শামুকখোল দেখা যায়।
তিনি আরও জানান, গত ৯-১০ বছর ধরে শামুকখোলের পাশাপাশি বালিহাঁস, পানকৌড়ি, মাছরাঙাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির সহাবস্থান ছিল। তবে কয়েক বছরের মধ্যে শামুকখোলের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। আশ্বিন মাসে এ পাখির আনাগোনা আরও বেড়ে যায়। তখন গ্রামের বিভিন্ন গাছে তারা বাসা বাঁধে, ডিম দেয় এবং ডিমে তা দিয়ে ছানা ফুটায়। শামুকখোলের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বালিহাঁস, পানকৌড়ি, মাছরাঙাসহ অন্য কয়েক প্রজাতির পাখির সংখ্যা কমেছে বলেও জানান তিনি। বর্তমানে গ্রামের অধিকাংশ বড় গাছ শামুকখোলে ভরে উঠেছে।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান জানান, তিনি একাধিকবার উলিপুরের পাখির গ্রাম পরিদর্শন করেছেন। তাঁর মতে, গ্রামের মানুষের পাখিপ্রেম এবং দায়িত্বশীল আচরণের কারণেই কয়েক বছর ধরে শামুকখোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এখানে নিরাপদে অবস্থান করতে পারছে। কয়েক মাস পর পাখিগুলো অন্যত্র চলে গেলেও পরে আবার উলিপুরে ফিরে আসে।
প্রকৃতি ও পাখির প্রতি স্থানীয় মানুষের এমন সহনশীল আচরণ উলিপুরকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। দিঘিকে ঘিরে গড়ে ওঠা গ্রামটির গাছগুলো এখন শুধু মানুষের বসতি নয়, অসংখ্য শামুকখোলেরও নিরাপদ আশ্রয়। পাখির কলকাকলিতে মুখর এই গ্রাম তাই স্থানীয় মানুষের কাছে যেমন পরিচিত, তেমনি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও হয়ে উঠছে আকর্ষণের জায়গা।