ভারতীয়
চলচ্চিত্র জগতের আকাশে এক গভীর ও
অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করে চিরদিনের মতো না ফেরার দেশে
চলে গেলেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শক্তিমান ও প্রভাবশালী অভিনেতা
নানা পাটেকর। আজ বৃহস্পতিবার সকালেই
দেশের এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের একাধিক প্রথমসারির সংবাদমাধ্যম তাঁর মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত করেছে। ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইয়ের বরাত দিয়ে দ্য ইকোনমিক টাইমস, নবভারত টাইমস, লাইভমিন্ট, এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতো
জনপ্রিয় গণমাধ্যমগুলো এই কিংবদন্তি শিল্পীর
প্রয়াণের খবর ফলাও করে প্রকাশ করেছে। অভিনেতা হিসেবে দীর্ঘ ও বর্ণিল কর্মজীবনে
তিনি বহু স্মরণীয় চরিত্র উপহার দিয়ে গেছেন, যা তাঁকে চলচ্চিত্রের
ইতিহাসে চিরদিন অমর করে রাখবে।
প্রাথমিক
সংবাদ সূত্রে জানা যায়, গোয়ার ডোনা পাউলায় অবস্থিত নিজের বাসভবনে হঠাৎ করেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এই গুণী অভিনেতা।
পরিবারের সদস্যরা তাঁকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পাওয়ার পর কালবিলম্ব না
করে দ্রুত স্থানীয় একটি স্বনামধন্য চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান। তবে চিকিৎসকদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাঁরা
তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। ৭৫ বছর বয়সে
তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণ
গোটা চলচ্চিত্র জগতে এবং তাঁর অগণিত ভক্তদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে।
প্রতিবেদন
সূত্রে জানা যায়, গোয়ার সুপরিচিত মণিপাল হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক শেখর সালকার গণমাধ্যমের কাছে এই মর্মান্তিক ঘটনার
বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। ওই চিকিৎসক গণমাধ্যমকে
জানিয়েছেন যে, অভিনেতাকে যখন অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়, তখন তাঁকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালান চিকিৎসকরা। টানা প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে নানা পাটেকরের ওপর কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন বা সিপিআর প্রক্রিয়া
চালানো হয়, যাতে হৃৎস্পন্দন পুনরায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।
কিন্তু
দুর্ভাগ্যবশত তাঁর শরীর থেকে চিকিৎসকদের এই প্রচেষ্টার বিপরীতে
কোনো ধরনের ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। এই অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর
পর প্রশাসনিক নিয়ম মেনে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি মেডিকো-লিগ্যাল কেস বা এমএলসি নথিভুক্ত
করা হয়েছে। পাশাপাশি, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিখুঁতভাবে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে তাঁর মৃতদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, হিন্দুস্তান টাইমসের প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে যে, নানা পাটেকরের সুযোগ্য সন্তান মালহার পাটেকর নিজ পিতার এই আকস্মিক ও
বেদনাদায়ক মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
১৯৫১
সালের ১ জানুয়ারি ভারতের
মহারাষ্ট্র রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই কিংবদন্তি অভিনেতা।
তাঁর মূল ও প্রকৃত জন্মগত
নাম ছিল বিশ্বনাথ পাটেকর, যদিও চলচ্চিত্র জগতে তিনি নানা পাটেকর নামেই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলেন। হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে
কয়েক দশকব্যাপী দীর্ঘ ও বর্ণিল বিস্তৃত
তাঁর অভিনয়জীবন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। নিজস্ব স্বকীয় অভিনয়ভঙ্গি, অত্যন্ত শক্তিশালী ও ঝাঁঝালো সংলাপ
বলার ভঙ্গি এবং যেকোনো জটিল চরিত্রে নিজেকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার অসাধারণ দক্ষতার জন্য তিনি ভারতীয় দর্শকদের মনে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছিলেন।
তাঁর
অভিনীত চলচ্চিত্রের তালিকাটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও সমাদৃত, যার
মধ্যে 'পরিন্দা', 'ক্রান্তিবীর', 'আব তক ছাপ্পান',
'অগ্নিসাক্ষী' এবং 'ওয়েলকাম'-এর মতো অসংখ্য
ব্লকবাস্টার ও জনপ্রিয় চলচ্চিত্র
দর্শকের মনে গভীর দাগ কেটেছে। দুর্দান্ত অভিনয়ের অসামান্য স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন। তাছাড়া, তাঁর শিল্পসাধনার স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের অন্যতম সম্মানজনক বেসামরিক খেতাব 'পদ্মশ্রী' সম্মাননায় ভূষিত করেছিল।