গত ৮ অক্টোবর ২০২৫ (বা ২০২৬) ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের জনপ্রিয় ও প্রতিভাবান অভিনেতা নানা পাটেকর ৭৫ বছর বয়সে গোয়ার নিজ বাড়িতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ভক্ত ও চলচ্চিত্র মহলে। এর মাঝেই তাঁর সহকর্মীদের স্মৃতিচারণে উঠে আসছে এই প্রবীণ অভিনেতার মানবিক নানা অজানা দিক। যার মধ্যে অন্যতম হলো—দুঃস্থ কৃষক পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে ১ কোটি ৫০ লাখ রুপির বিলাসবহুল গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত আকস্মিকভাবে বদলে ফেলার এক অনুপ্রেরণামূলক ঘটনা।
চলতি মাসের শুরুতে ভারতীয় চিত্রনাট্যকার, ঔপন্যাসিক ও পরিচালক রণবীর পুষ্প এক পডকাস্টে নানা পাটেকরের এই মানবিক উদ্যোগের কথা প্রকাশ্যে আনেন। সিদ্ধার্থ কান্নানের পডকাস্টে রণবীর জানান, কৃষক আত্মহত্যার মর্মান্তিক খবর দেখে মারাত্মকভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন নানা। ঠিক তার পরদিনই তাঁর ১ কোটি ৫০ লাখ রুপি মূল্যের একটি নতুন গাড়ি কেনার পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কৃষকদের দুর্দশা দেখে তিনি গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত তৎক্ষণাৎ বাতিল করেন। পরিবর্তে তিনি তাঁর এক শিল্পীবন্ধুকে ফোন করে ১৫ হাজার রুপির চেক প্রস্তুত করতে বলেন এবং তা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলোর মধ্যে বিতরণের নির্দেশ দেন। কৃষকদের এই দুরবস্থা থেকে রক্ষা করার তাড়না থেকেই পরবর্তীতে তিনি গড়ে তোলেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’, যা আজ কৃষক আত্মহত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে।
শুধু মানবিকতাই নয়, নানা পাটেকরের নিখাদ দেশপ্রেম ও সুনাগরিকসুলভ কঠোর ব্যক্তিত্বের নানা দিকও তুলে ধরেছেন রণবীর পুষ্প। তাঁর মতে, নানা অকারণে কখনোই মেজাজ হারাতেন না; বরং সমাজ বা রাস্তার কোনো অন্যায় বা দায়িত্বহীনতা দেখলে তিনি তার প্রতিবাদ করতেন। একবার এক ব্যক্তি চলন্ত গাড়ি থেকে রাস্তায় ময়লার বোতল ফেলে দেওয়ার পর নানা নিজের গাড়ি থামিয়ে বোতলটি কুড়িয়ে নেন। এরপর ট্রাফিক সিগন্যালে গিয়ে ওই ব্যক্তির গাড়ির জানালা খুলতে বলে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় প্রশ্ন করেছিলেন, “ভারতকে পরিষ্কার রাখবে কে? গান্ধীজি তো চলে গেছেন, কিন্তু তুমি তো এখনো এই পৃথিবীতে আছ! একজন নাগরিক হিসেবে দেশকে পরিষ্কার রাখা কি তোমার দায়িত্ব নয়? তোমার গাড়িটাকে যদি ডাস্টবিন ভেবে বোতলটি ভেতরে ছুড়ে দিই, তবে কেমন লাগবে?”
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নানা পাটেকর ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে পা রাখেন। এরপর ‘পরিিন্দা’, ‘প্রহার’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অব তক ছাপ্পান’, ‘অপহরণ’, ‘যশবন্ত’, ‘নটসম্রাট’ ও ‘ওয়েলকাম’-এর মতো অসংখ্য ব্যবসাসফল ও ক্ল্যাসিক সিনেমায় অভিনয় করে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে অমর এক স্থান করে নেন। অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ২০১৩ সালে মর্যাদাপূর্ণ ‘পদ্মশ্রী’ সম্মাননা লাভ করেন। এছাড়া ‘ওয়েলকাম’ ও ‘ওয়েলকাম ব্যাক’-এ ‘উদর শেঠি’ চরিত্র এবং সাম্প্রতিক সময়ে ‘হাউসফুল ৫’-এ তাঁর অভিনয় ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অভিনয়ে সক্রিয় থাকা এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মহৎ উদ্যোগগুলো নানা পাটেকরকে মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।