বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের মনোজাগতিক কাঠামোর যে গভীর পরিবর্তন ঘটে চলেছে, তার ওপর ভিত্তি করে অদূর ভবিষ্যতে দেশে প্রধান দুটি রাজনৈতিক ধারার উত্থান দেখছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। সম্প্রতি বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের জনপ্রিয় আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এই বিষয়ে স্পষ্ট যৌক্তিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতির ময়দানে বাম ও মধ্য-বাম শক্তি হিসেবে একদিকে থাকবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ ডানপন্থী ধর্মীয় শক্তিগুলোর একটি বড় ঐক্য গড়ে উঠবে। আর এই দুই মেরুর রাজনীতির ফলে প্রধান বিরোধী শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির জন্য এক ধরনের বড় রাজনৈতিক ও ভোটিং সংকটের সৃষ্টি হতে পারে।
টেলিভিশন টকশোতে দেওয়া বক্তব্যে রাজনীতিকে নিজের জীবনের অন্যতম চর্চা উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা জানান, আবেগ দিয়ে রাজনীতি বিচার না করে দীর্ঘমেয়াদী সমীকরণ হিসাব করলে এটি স্পষ্ট বোঝা যায়। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে একটি জোটে গঠিত হবে বামপন্থী চিন্তাধারা বা ‘লেফট ফোর্স’, যার মূল নেতৃত্ব দেবে আওয়ামী লীগ ও তাদের সমমনা বাম দলগুলো। অপর মেরুতে একত্রিত হবে দেশের বৃহৎ ডানপন্থী ও ধর্মীয় ভাবধারার দলসমূহ। তিনি বিশেষভাবে আলোকপাত করেন হেফাজতে ইসলামকে ঘিরে গড়ে ওঠা নতুন সাতটি ধর্মীয় দলের ঐক্যের দিকে।
তিনি মনে করেন, নীতিগত বিভেদ থাকলেও ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রয়োজনে যদি হেফাজত এবং জামায়াতে ইসলামীর কোনো সমঝোতা গড়ে ওঠে, তবে তা রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী ডানপন্থী মেগা প্লাটফর্মে রূপ নেবে। যেহেতু বিএনপি মূলত ডান এবং মধ্য-ডানপন্থী ঘরানার একটি বড় ভোটব্যাংকের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাই এই ধর্মীয় ডানপন্থী শক্তির উত্থান ঘটলে বিএনপির স্থায়ী ভোট ব্যাংকে বড় ধরনের ধস নামার চরম সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে বিএনপি সংকুচিত হয়ে পড়বে এবং ভোটগুলো চলে যাবে নতুন রাইট ফোর্সের অ্যাকাউন্টে।
জামায়াতে ইসলামীর ক্ষমতার সমীকরণে উঠে আসার সম্ভাবনা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে এই আইনপ্রণেতা মন্তব্য করেন, জামায়াতের পক্ষে ক্ষমতায় আসা পুরোপুরি অসম্ভব নয়। এর পেছনে তিনি ভারতের কেন্দ্রে শাসক দল বিজেপির দীর্ঘ রাজনৈতিক পুনরুত্থানের উদাহরণ টেনে জামায়াতের চরম দলীয় শৃঙ্খলা ও আধুনিক সাংগঠনিক কাঠামোর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের ভেতর সর্বোচ্চ স্তরের শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়।
একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে মাঠকর্মী থেকে শুরু করে দলের আমীর পর্যন্ত প্রত্যেকেই অর্জিত আয়ের একটি নির্ধারিত নির্দিষ্ট অংশ নিয়মতান্ত্রিকভাবে দলীয় তহবিলে অনুদান দিয়ে থাকেন। যার কারণে কোনো নেতাকর্মী জেলে গেলে বা আইনি ও আর্থিক সংকটে পতিত হলে দলটি তাৎক্ষণিকভাবে অভিভাবক হয়ে পুরো পরিবারের পাশে শক্ত ভিত্তি নিয়ে গিয়ে দাঁড়ায়।
পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের মেধা ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা জামায়াতের সুদূরপ্রসারী ‘ইকোসিস্টেমের’ বিষয়েও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন রুমিন ফারহানা। তিনি ব্যাখ্যা করেন, জামায়াত দরিদ্র পরিবারের বহু মেধাবী তরুণকে চিহ্নিত করে নিজেদের খরচে দেশে ও বিদেশে উচ্চতর শিক্ষার ব্যবস্থা করে ব্যারিস্টার কিংবা বিভিন্ন পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তোলে। পরবর্তী সময়ে এই দক্ষ তরুণেরা কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে দলের জন্য কম খরচে বা বিনামূল্যে আইনি ও পেশাদার সেবা প্রদান করে থাকে।
অনুরূপভাবে বিবিএ, এমবিএ কিংবা ডাক্তারি পাস করা তরুণেরা জামায়াত পরিচালিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং হাসপাতালগুলোতে ক্যারিয়ার গড়ার নিশ্চিত সুযোগ পেয়ে যায়। এই সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক ও মেধা লালনের ব্যবস্থার ফলেই জামায়াতের শিকড় সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক গভীরে প্রোথিত হচ্ছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী ও প্রতিষ্ঠিত দলসমূহ যদি তাদের নিজেদের ভেতরের কৌশলগত ও সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং অবস্থান সংশোধন করতে ব্যর্থ হয়, তবে আগামী দিনে দেশের পুরো রাজনৈতিক সমীকরণ আওয়ামী লীগ এবং জামায়াত কেন্দ্রিক দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।