একবার নয়, দুইবার নয়, নয় বার। দশম বারে আত্মহত্যা করতে গিয়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে জীবন যুদ্ধে পরাজিত এক সৈনিক। ভিতরের গর্জন, না- আত্মহত্যা নয়, আত্মহত্যা করা মহাপাপ, আত্মহত্যা যে করে সে কাপুরুষ। আমি তো কাপুরুষ নই। পাতলা শরীর হলেও আমি শক্তিশালী। জীবনের কাছে হেরে যাবো কেন? কঠোর পরিশ্রম করবো, দেখবেন একদিন সুখ ধরা দিবে।
প্রতিটা মানুষের ব্যর্থতা আছে হতাশা আছে। তাই বলে থেমে যাওয়া নয়, ব্যর্থতা মানে নতুন করে শুরু করা। তাই পরিকল্পনা, চললো সফলতা জয়ের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে ঘাটে ঘাটে মার খাওয়া সৈনিক দেখিয়ে দিলেন পরিশ্রমই সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। কে এই সৈনিক? এই সৈনিক হলেন গ্রী-স্টার কোম্পানির কর্ণধার হোসাইন মজুমদার।
বাড়ি কুমিল্লার দেবীদ্বার। কৃষক পরিবারে জন্ম। বাবা-হাজী আব্দুল মান্নান মজুমদার, মাতা-আয়শা খাতুন। হাই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই বাবার সাথে পরিশ্রম আর পরিশ্রম। টানাপোড়েন সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে হেনো কাজ নেই তিনি করেননি। ব্যবসা করতে গিয়ে আপনজনের কাছে বাবাকে অপদস্ত হতে হয়। তার সামনে এই অপদস্ত মনে দাগ কাটে। উপলব্ধি করতে পারেন জীবন নামের রেলগাড়িটা কত কষ্টের। প্রতিজ্ঞা করলেন কষ্টকে জয় করতেই হবে। তাই লজ্জা-শরম ত্যাগ করে যে কোন কাজ করতে হবে।
মাত্র সাড়ে ১৭ বছর বয়সে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে দুই নম্বর পাসপোর্টে গেলেন মালয়েশিয়ায়। শুরু হলো দেশের বাইরে অগ্নিপরীক্ষা। সাত দিন না যেতেই ধরা খেলেন। পুলিশের রিমান্ড-নির্যাতনের পর দেশে ফিরে আসতে হলো।
আশা না হারিয়ে এক সপ্তাহ পর অর্থাৎ ২০০০ সালে তিনি আবার মালয়েশিয়ায় গেলেন। অল্প টাকার চাকরি, সীমাহীন পরিশ্রম। এমন কঠিন কাজে তিনি মাঝে মধ্যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। জ্ঞান ফেরার পর ভাবতেন সংসার কীভাবে চলছে, বোনের ফরম ফিলাপের টাকা সংগ্রহ করতে পারিনি, নিজের শীর্ষাও আটকে গেল। এসব ব্যর্থতা তাকে অনবরত পীড়া দিতো। কিন্তু মনোবল হারাননি। মনে একটাই ভাবনা- সফলতা। আকামা না থাকায় দেড় বছরের মাথায় পুলিশের কাছে ধরা। রিমান্ডে নিয়ে পুলিশের নির্যাতন। বাধ্য হয়ে ফের দেশে ফেরা।
নিরুপায় জনাব মজুমদার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন, এবারের যাত্রা হবে ইউরোপ মহাদেশের গ্রীক সাইপ্রাসে। এটি ভূমধ্যসাগরের একটি উন্নত দেশ। এখানে উচ্চ শিক্ষাও অর্জণ, পাশাপাশি ব্যবসা করে অনেক টাকাও উপার্জন করা যাবে। যেই কথা সেই কাজ। গেলেন সাইপ্রাসে। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি ধরলেন। কিন্তু কাঙ্খিত টাকা উপার্জন না হওয়ায় মনে হলো সফলতায় যেন ভাটা পড়ে গেল। তাই লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে তিনি রাতদিন হকারি করা শুরু করে দিলেন। হকারি করতে গিয়ে তাকে ৩৬টি দেশের সাথে টেক্কা দিতে হয়েছে। এজন্য ১০-১২টি ভাষা শিখতে হয়েছে। তার পরিচিতি বেড়ে গেল নাম্বার ওয়ান হকার নামে। ফলে অন্যদের চেয়ে ৪ গুণ টাকা উপার্জন হতে থাকলো।
এবার মনের ইচ্ছে এখান থেকে গ্রীসে যাওয়ার। কিন্তু বিধি বাম। যাবার পথে ধরা পড়লো পুলিশের হাতে। বুঝতেই পারছেন পুলিশের হাতে ধরা পড়লে যা হয় তাই হলো। তাদের কয়েক জনকে বড় বড় ট্রাংকে ভরে নিয়ে যাওয়া হলো তুরস্কের আঙ্কারায়। সেখানে আরেক বিপদ। তাদের নাকি মারতে মারতে ইরান-পাকিস্তান দিয়ে পাঠিয়ে দিবে নিজ নিজ দেশে। কিন্তু ভাগ্য ভালো- জনাব মজুমদারের উপস্থিত বুদ্ধির কারণে সবাই রক্ষা পেয়ে গেলো। সিদ্ধান্ত নিলেন আর নয় বিদেশ এবার আসল ঠিকানা স্বদেশ। বিদেশের পাঠ চুকিয়ে চলে আসেন দেশে।
দেশে এক বছর বেকার। চেনা লোক অচেনা। কি করবে, কোথায় যাবে। যেখানেই যান সেখানেই হতাশা-দুরাশা। অর্থাৎ হতাশা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়া হতাশা নিয়ে জেগে ওঠা। পড়ে গেলেন মহাবিপদে। যখনই হতাশ তখনই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত। এভাবে একে একে নয় বার।
দশম বারে আত্মহত্যার ফাইনাল সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ভিতরের শক্তি গর্জে উঠলো। মরবো না বাঁচবো? বাঁচার মতো বাঁচবো, বীরের মতো বাঁচবো। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে মাথায় আঁটলেন পাঁচ বছরের প্ল্যানিং। অন্তরে ধারণ করলেন যেখানে সততা, নিষ্ঠা, একাগ্র সাধনা সেখানে সফলতা অনিবার্য। হে আল্লাহ তুমি সহায়।
২০১২ সালে ঢাকার ধোলাইপাড়ে হাসান নামের এক রিকসাচালকের সঙ্গে পরিচয়। তিনি কয়েলের ব্যবসা করতেন। ১৫ বছরেও তিনি লাভের মুখ দেখেননি। কেন দেখেননি তার আদ্যোপান্ত শুনলেন। হোসাইন মজুমদার ব্যবসা আবার চালানো যায় কীনা নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়ই আলোচনা হতো। এক পর্যায়ে হাসানের পরামর্শমতো তাকে নিয়েই তুলসী পাতা দিয়ে মশার কয়েল ব্যবসা শুরু করলেন। হাসান-হোসাইন দুজন মিলে দোকানে দোকানে গিয়ে কয়েল বিক্রি করতেন। এভাবে চলতে থাকলো কয়েক বছর। এক পর্যায়ে কয়েলের ব্যবসা পরিবার মেনে নিতে পারলেন না।
বাধ্য হয়ে নিজ বাড়ি ছেড়ে যেতে হলো ভৈরবে। ভৈরববাসীর সহযোগিতায় অল্পদিনেই তুলসীপাতা মশার কয়েলের ব্যাপক মার্কেট পেল। এই কয়েলের সাথে টিকতে না পেরে ১৩টি প্রতিষ্ঠিত কয়েল ফ্যাক্টরী বন্ধ হয়ে গেল। ব্যবসা গুটিয়ে ব্যবসায়ীরা ভৈরব ছাড়তে বাধ্য হল। শুরু হলো ষড়যন্ত্র। তারা একজোট হয়ে তুলসীপাতা মশার কয়েলের লাইসেন্স আটকে দিলো। কী আর করা- এবার তিনি পাতাবাহারের সাথে আরো দুটি কয়েল কোম্পানীর অনুমতি চেয়ে পুনরায় দরখাস্ত করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি একসাথে তিন নামে মশার কয়েলের পারমিশন পেয়ে গেলেন।
সেই পাতাবাহার কয়েল কোম্পানীই আজ বৃহৎ পরিসরে গিয়ে নাম হয়েছে গ্রী-স্টার পাতাবাহার গ্রুপ অব কোম্পানী এবং কনফিডেন্স তুলশীপাতা গ্রুপ অব কোম্পানী। এই দুই কোম্পানী থেকে আরও যেসব পণ্য উৎপাদিত হয় তাহলো- ভোজ্য তেল, কালিজিরা তেল, সরিষার তেল, হাতে ভাজা মুড়ি, চিনি, গুড়া চাল, মিষ্টি জাতীয় পণ্য, মধু, পানীয়, সফট ড্রিঙ্ক অরেঞ্জ, সফট ড্রিঙ্ক ম্যাংগো, চা পাতা ও ডিটারজেন্ট পাউডার। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বহু লোকের জীবিকা নির্বাহ হয়।
প্রতিষ্ঠানের
ম্যানেজিং ডিরেক্টর হোসাইন মজুমদার বিনোদন খোরাক মেটানোর জন্য কোটি টাকা
ব্যয় করে প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের
নিয়ে প্রতিবছর জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করে থাকেন ।
পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কাজেও ছুটে যান নিরহংকারী
সদাহাস্য সংগ্রামী এই মানুষটি। শুধু
তাই নয় ভালো অবস্থানে
থেকেও তিনি তার জীবনের
অতীত জনসমাবেশে প্রকাশ করে বড় মনের
পরিচয় দেন।
একজন
দেশপ্রেমিক হিসাবে তিনি বলেন মানুষকে
শক্তিশালী করার জন্য এমন
কিছু প্রতিষ্ঠান দরকার যে প্রতিষ্ঠান ভেজালমুক্ত
খাবার দিতে পারবে। ভালো
খাবার পেলে জাতি হবে
শক্তিশালী, বাড়বে বুদ্ধিমত্তা। ফলে দেশ যাবে
এগিয়ে।
তার
ধারণা সফল উদ্যোক্তা হতে
গেলে প্রতি মুহূর্তে স্পিরিট থাকতে হবে, শরীরে জ্বলবে
আগুন। তবেই সফলতা আসবে।
তার অঙ্গীকার দেশের সকল ভোক্তার হাতে
নির্ভেজাল পণ্য পৌছে দেয়া।যেখানে
থাকবে না কোন কম্প্রোমাইজ।
--মীর
লিয়াকত আলী