ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,  ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাষ্ট্রচালনা ও আইসিটি’র রায়ে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত—আমরা জনগণ কতটা জানি?


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ২৫ নভেম্বর, ২০২৫ সময় : ৪:৪১ পিএম


-ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাসিমুল গণি, পিএইচডি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি (অব.)।

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো “২০২৪ সালের ০৫ আগস্ট দুপুরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কুর্মিটোলা এয়ারফোর্স ঘাঁটি থেকে সি–১৩০ পরিবহন বিমানে দেশত্যাগ করেন এবং ভারতে নিরাপদে পৌঁছান, যেখানে ভারতীয় পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তাকে গ্রহণ করেন।এই সময়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গণমানুষ গণভবন দখল করে। পরবর্তীতে ০৮ আগস্ট বিদ্যমান সংবিধানের আওতাধীনে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে প্রধান উপদেষ্টা করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ গ্রহণ করে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনগণের এই গণ-আন্দোলনের পাশে দাঁড়ায় এবং ০৫–০৮ আগস্টের মধ্যে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে ভূমিকা পালন করে।"

একটি রাষ্ট্র সাধারণত চারটি স্তরে পরিচালিত হয় "ট্যাকটিক্যাল, অপারেশনাল, স্ট্র্যাটেজিক এবং গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক।" এগুলোর বিস্তারিত এখানে আলোচনার বাইরে। সামরিক বাহিনী সব স্তরেই কাজ করে এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাদের কার্যক্রম সমন্বিত থাকে। রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গও এসব স্তরের কাজে জড়িত। তবে সাধারণতঃ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেবল কূটনৈতিক দিকগুলোতে সমন্বয় রাখে— অন্যন্য মন্ত্রনালয়কে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে না। তাই প্রকৃত সমন্বয়, যোগাযোগ, সামঞ্জস্য নির্ভর করে রাষ্ট্রচালনার জ্ঞান, পেশাদারিত্ব এবং নির্ধারিত প্রটোকলের ওপর।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রচালনা ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩’ অনুসারে চলে। “সিক্রেট” এবং “টপ সিক্রেট” তথ্য অপারেশনাল, স্ট্র্যাটেজিক ও গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্তরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এসব তথ্য ২০, ২৫, ৩০ বা ৫০ বছর পর প্রকাশ করে। যেমন, ১৯৪৫ সালে বহু নাৎসি কর্মকর্তা আর্জেন্টিনায় পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল যা অনেক পরে ইতিহাসে প্রকাশিত হয়। কিন্তু শেখ হাসিনার পলায়ন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে আইসিটি’র সাম্প্রতিক মৃত্যুদণ্ডের রায় এক নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে যা “রিয়েল টাইমে” রাষ্ট্রের গোপন তথ্য প্রকাশের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য এটি সার্বভৌমত্ব ও টিকে থাকার প্রশ্ন। দুই দেশের সম্পর্ক ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ট্যাকটিক্যাল স্তরে প্রশ্ন উঠছে সেনাবাহিনী শেখ হাসিনার দেশত্যাগে কী ভূমিকা রেখেছিল? গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চায়ের আড্ডা, সব জায়গায় মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এছাড়াও নানা প্রশ্নঃ

 • সামরিক হেফাজতে থাকা ৬২৯ জনকে কীভাবে মুক্তি দেওয়া হলো?

 • রাজনৈতিক দলগুলো কেন জাতীয় ঐক্য সরকারের পরিবর্তে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মেনে নিল?

 • উপদেষ্টা নির্বাচন কীভাবে হলো?

 • নির্বাচন কমিশন, দুদক, বিভিন্ন কমিটির সদস্যরা কীভাবে নির্ধারিত হলো?

 • জুলাই বিপ্লবের নেপথ্য কুশীলব কারা?

 • ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ, ঘুষ, পদোন্নতি-বাণিজ্য ইত্যাদি কেন ঘটল?

 • অন্তর্বর্তী সরকার কেন সামরিক বাহিনীকে রাষ্ট্রচালনা থেকে দূরে রাখল?

 • জুলাই চার্টার ও ডিক্লারেশন প্রকাশে বিলম্ব কেন হলো?

 • সামরিক ও শিক্ষা সংস্কারের তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা গ্রহণ না করার কারণ কী?

জনগণ মূলত ট্যাকটিক্যাল স্তরে আটকে আছে। কিন্তু 'প্যান্ডোরার বাক্স' খুললে, সব স্তরে, সব অঙ্গের অপরাধীকে খুঁজে বের করতে হবে। শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের ICT–তে স্বীকারোক্তি/গোপন তথ্য প্রকাশের পর সেনাবাহিনী হয়তো রাষ্ট্ররক্ষার স্বার্থে তাদের ভূমিকায় ‘দায়মুক্তি’ পেতে পারে। এতে ভুল ধারণা দূর হবে এবং মনোবল বাড়বে যা পেশাদারিত্বের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ১৭ নভেম্বর ২০২৫ আইসিটি রায় ঘোষণার পর পরিস্থিতি নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। আইসিটি তাদের দীর্ঘ তদন্ত, জাতিসংঘের রিপোর্ট, প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগীসহ সব প্রমাণ বিশ্লেষণ করে রায় দিয়েছে। এখন শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা ইতিহাসের অংশ হলেও জীবিত।তাদের আদালতে এসে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু যদি স্ট্র্যাটেজিক ও গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্তরের বাস্তব খেলোয়াড়েরা সিদ্ধান্ত নেন তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে না,

তাহলে সত্য প্রকাশ সম্ভব নয়।

 ভারতের অবস্থান এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ উদাহরণ তৈরি করেছে, সত্য গোপন না রেখে সময়মতো জনগণকে জানানো। ভারতকে উচিতঃ

 • শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো, পলাতক অপরাধীদের বাংলাদেশ পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া,

 • কোনো কূটনৈতিক অপচেষ্টা না করা।

ভারত ইতিমধ্যে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে একটি লাল দাগ অতিক্রম করেছে।এখন কোনো নেতিবাচক সিদ্ধান্ত হলে সেটি বাংলাদেশে আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে। বাংলাদেশের জনগণ ও সামরিক বাহিনী সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রস্তুত।ভারতের জন্যও ঝুঁকিঃ

 • নৈতিক অবস্থান হারাবে,

 • গণতন্ত্রের মূল্যবোধ দুর্বল হবে,

 • আন্তর্জাতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে,

 • আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

ইতিহাস বলছে আন্তর্জাতিক অপরাধে বিচার বাস্তবায়ন খুব বিরল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নিউরেমবার্গ ট্রায়াল সফল হয়েছিল মিত্রশক্তির সমর্থনে।১৯৭৩ সালের শিমলা চুক্তিতে ভারত ও পাকিস্তান মিলে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে বিচারের হাত থেকে রক্ষা করে, বাংলাদেশ তখন একা ছিল।তাই, আইসিটি’র এই রায় ও বাস্তবায়ন বাংলাদেশের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

 

উপসংহার

বাংলাদেশ শান্তিপ্রিয় দেশ।জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে তা প্রমাণ করেছে। তাই আমরা আশা করি ভারত প্রতিবেশী হিসেবের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে, সত্য গ্রহণ করবে, এবং সম্পর্ক নতুনভাবে পুনর্গঠনে আন্তরিক হবে ইতিহাস তার পথ খুঁজে নেবে।বাংলাদেশ সত্যের পথে এগিয়ে যাবে।

 

-ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাসিমুল গণি, পিএইচডি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি (অব.)

ghaniboby@yahoo.com


এ সম্পর্কিত আরো খবর