পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে বিস্তৃত উঁচু–নিচু ভূমি, মহাসমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন, অথবা নির্জন অরণ্যের শিশির ও পাতার শব্দ—নাগরিক জীবনের চাপের মধ্য দিয়ে মানুষ এই অভিজ্ঞতাগুলোকে অমূল্য মনে করে। নতুন দেশ, নতুন মানুষ ও সংস্কৃতি দেখার আকর্ষণও পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করছে।
জাতিসংঘের পর্যটন সংস্থা ইউএন ট্যুরিজমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটন থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আয় হয়েছে মোট ১.৭৪ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ৭৪ হাজার কোটি ডলার। মহামারির আগে ২০১৯ সালের তুলনায় এটি ১৪ শতাংশ বেশি।
পর্যটন আয় নির্ভর করে নানা বিষয়ের ওপর। পর্যটকের সংখ্যা, প্রত্যেক পর্যটকের গড় ব্যয়, দেশীয় অবকাঠামোর মান—all এসব গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটকগণ গড়ে বেশি ব্যয় করেন, যেখানে মালদ্বীপের মতো ছোট দেশেও ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি। চলুন দেখি, ২০২৪ সালে কোন দেশগুলো পর্যটন আয় থেকে শীর্ষে।
১. যুক্তরাষ্ট্র — আয়: ২১৫ বিলিয়ন ডলার
যুক্তরাষ্ট্র ২০২৪ সালে বৈশ্বিক পর্যটন আয়ের শীর্ষে রয়েছে। স্পেন ও ফ্রান্সকে পেছনে ফেলে, দেশটি ৮ কোটি পর্যটক আকর্ষণ করেছে। গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন, নিউইয়র্কের আকাশচুম্বী ভবন, ডিজনি থিম পার্ক, লাস ভেগাসের বিনোদনকেন্দ্র—এসবই যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটকপ্রিয়তা বৃদ্ধি করেছে। জেএফকের মতো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বিস্তৃত সড়ক নেটওয়ার্কের কল্যাণে যাতায়াত সহজ। পর্যটকগণ গড়ে প্রতি সফরে চার হাজার ডলার খরচ করেন।
২. স্পেন — আয়: ১০৬.৫ বিলিয়ন ডলার
স্পেন পর্যটন আয়ের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্থানে। বার্সেলোনা ও মাদ্রিদের খেলা, সাগরাদা ফামিলিয়া, প্রাদো মিউজিয়াম, কোস্তা দেল সোল, আলহাম্বরা—এগুলো দেশটিকে আকর্ষণীয় করেছে। ২০২৪ সালে দেশটিতে ৯ কোটি ৪০ লাখ পর্যটক এসেছেন। ইউরোপের দেশগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি পর্যটক এসেছে। গড় পর্যটক ব্যয় ১,৩২৭ ইউরো।
৩. যুক্তরাজ্য — আয়: ৮২.৫ বিলিয়ন ডলার
যুক্তরাজ্যের পর্যটন আয় তৃতীয়। ২০২৪ সালে ৪ কোটি ১২ লাখ পর্যটক দেশটি ভ্রমণ করেছেন। লন্ডনের বিগ বেন, টাওয়ার ব্রিজ, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, এডিনবরার ক্যাসেল, স্টোনহেঞ্জ, লেক ডিস্ট্রিক্ট—এসব দর্শনীয় স্থান রয়েছে। হিথরো বিমানবন্দর, ইউরোস্টার ট্রেন ও মোটরওয়ে নেটওয়ার্ক দেশজুড়ে যাতায়াত সহজ করেছে।
৪. ফ্রান্স — আয়: ৭৭ বিলিয়ন ডলার
ফ্রান্স ২০২৪ সালে ১০ কোটির বেশি আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণ করেছে। আইফেল টাওয়ার, ল্যুভর, ভার্সাই প্রাসাদ, ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার সৈকত—সবই দর্শনার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্যারিস শার্ল দ্য গল বিমানবন্দর, উচ্চগতির ট্রেন ও বিস্তৃত মেট্রো নেটওয়ার্কের কারণে যোগাযোগ সহজ।
৫. ইতালি — আয়: ৫৮.৭ বিলিয়ন ডলার
ইতালি ২০২৪ সালে প্রায় ৭ কোটি ১০ লাখ পর্যটক আকর্ষণ করেছে। রোমান কলোসিয়াম, ভেনিস খাল, ফ্লোরেন্স উফিজি, আমালফি উপকূল, টাসকানির আঙুরক্ষেত—এসব পর্যটকের আকর্ষণ। উচ্চগতির ট্রেন, রোম ফিউমিচিনো বিমানবন্দর ও ফেরির কল্যাণে দেশজুড়ে যাতায়াত সহজ।
৬. সংযুক্ত আরব আমিরাত — আয়: ৫৭ বিলিয়ন ডলার
দুবাই ২০২৪ সালে ১ কোটি ৮৭ লাখ রাতের পর্যটক গ্রহণ করেছে। বুর্জ খলিফা, দুবাই মল, পাম জুমেইরাহ সৈকত, বিলাসবহুল রিসোর্ট—এসব প্রধান আকর্ষণ। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং আধুনিক মেট্রোব্যবস্থা পর্যটন সহজ করেছে।
৭. তুরস্ক — আয়: ৫৬.৩ বিলিয়ন ডলার
২০২৪ সালে ৫ কোটি ২৬ লাখ বিদেশি পর্যটক এসেছে। ইস্তানবুলের হায়া সোফিয়া, কাপাদোকিয়ার হট এয়ার বেলুন, ইফেসাস ধ্বংসাবশেষ, আনাতোলিয়ার সৈকত—এসব আকর্ষণ। ইস্তানবুল বিমানবন্দর, উচ্চগতির ট্রেন ও উপকূলীয় মহাসড়ক যাতায়াত সহজ করেছে।
৮. জাপান — আয়: ৫৪.৭ বিলিয়ন ডলার
টোকিওর শিবুয়া ক্রসিং, সেনসো-জি মন্দির, কিয়োটোর ফুশিমি ইনরি, মাউন্ট ফুজি, হিরোশিমা স্মৃতিসৌধ—এসব জাপানের প্রধান আকর্ষণ। বুলেট ট্রেন, নারিতা ও হানেদা বিমানবন্দর, সাবওয়ে নেটওয়ার্ক পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করেছে।
৯. অস্ট্রেলিয়া — আয়: ৫৪.৭ বিলিয়ন ডলার
সিডনি অপেরা হাউস, হারবার ব্রিজ, গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, মেলবোর্ন লেনওয়ে সংস্কৃতি ও গোল্ড কোস্ট সৈকত—এসব পর্যটকদের আকর্ষণ। সিডনি ও মেলবোর্ন বিমানবন্দর, ট্রান্স-অস্ট্রেলিয়ান রেল, ক্যাঙারু ও কোয়ালাসহ বন্যপ্রাণী পর্যটকদের আকর্ষণ করছে।
১০. কানাডা — আয়: ৪৯.৯ বিলিয়ন ডলার
নায়াগ্রা জলপ্রপাত, বানফ-লেক লুইস, ভ্যাঙ্কুভারের স্ট্যানলি পার্ক, টরন্টোর সিএন টাওয়ার ও কুইবেক সিটি—এসব আকর্ষণ। টরন্টো পিয়ারসন বিমানবন্দর, ট্রান্স-কানাডা হাইওয়ে ও রেল যাতায়াত সহজ করেছে। প্রতি সফরে পর্যটকের গড় ব্যয় ১,৪০০ কানাডীয় ডলার।
বাস্তবতা হলো, বিশ্বের ধনীরা পণ্য কেনার চেয়ে অনন্য অভিজ্ঞতায় বেশি আগ্রহী। মধ্যবিত্তের সংখ্যাও বাড়ছে, ফলে ভ্রমণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেসব দেশে পর্যটন বেশি, সেসব দেশের অবকাঠামো ও যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হলেও পর্যটক আকর্ষণে পিছিয়ে রয়েছে।
আকাশজমিন / আরআর