আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রায় চার বছরে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাংক সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত রাশিয়া ও ইউক্রেন মিলিয়ে নিহত, আহত ও নিখোঁজ হয়েছেন ১৮ লক্ষাধিক সেনা। বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক ইতিহাসে এটি অন্যতম রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হতাহতের সংখ্যার দিক থেকে রুশ বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি ইউক্রেনের তুলনায় অনেক বেশি। মোট হতাহতের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ সেনাই রাশিয়ার। এই ১২ লাখ রুশ সেনার মধ্যে নিহত হয়েছেন ৩ লাখ ২৫ হাজারের কিছু বেশি। বাকিদের বড় একটি অংশ গুরুতর ও মাঝারি মাত্রায় আহত হয়েছেন। এছাড়া কয়েক হাজার সেনা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
CSIS-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো বৃহৎ সামরিক শক্তি বিশ্বের কোথাও কোনো যুদ্ধে এত বেশি সেনা হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েনি। রাশিয়ার মতো একটি সামরিক পরাশক্তির জন্য এই ক্ষয়ক্ষতি শুধু মানবিক দিক থেকেই নয়, সামরিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ কৌশলগত পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের ক্ষয়ক্ষতিও কম নয়। প্রায় চার বছরের এই যুদ্ধে দেশটির ৬ লাখের বেশি সেনা নিহত, আহত ও নিখোঁজ হয়েছেন। CSIS-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইউক্রেনীয় বাহিনীর নিহত সেনার সংখ্যা ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজারের মধ্যে। আহত সেনাদের সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়া দ্রুত সামরিক সাফল্যের আশা করলেও বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরোধ, পশ্চিমা সামরিক সহায়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী লড়াই রাশিয়ার জন্য যুদ্ধকে জটিল ও ব্যয়বহুল করে তুলেছে। এর ফলে রুশ বাহিনীকে ব্যাপক জনবল ও অস্ত্রশস্ত্রের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যদি বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধ চলমান থাকে, তাহলে ২০২৬ সালের বসন্তকাল নাগাদ দুই দেশের মোট হতাহতের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখে পৌঁছাতে পারে। এই সম্ভাব্য সংখ্যা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো যুদ্ধ বন্ধে নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পেছনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে রুশ ভূখণ্ড হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করা এবং ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য কিয়েভের তদবির ঘিরে কয়েক বছর ধরেই দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল। সেই উত্তেজনার জের ধরেই ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে রুশ বাহিনী।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে শুরু হওয়া এই সামরিক অভিযান এখনো চলমান রয়েছে। যুদ্ধের সময়সীমা যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা ও মানবিক সংকট। লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে অবকাঠামো, এবং অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলো।
CSIS-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেনের জন্য নয়, বরং পুরো ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, খাদ্য সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও স্পষ্টভাবে পড়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামরিক ক্ষয়ক্ষতির এই পরিসংখ্যান যুদ্ধের বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করে তুলছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশলগত অগ্রগতি যতই হোক না কেন, মানবিক ক্ষয়ক্ষতি দিন দিন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য যুদ্ধ অবসানে কার্যকর কূটনৈতিক সমাধান খোঁজা এখন সময়ের দাবি।
সূত্র : এএফপি
আকাশজমিন / আরআর