বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে এক গভীর আস্থাহীনতা ও সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন ব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী দলের রাজনৈতিক পরিসর—সবকিছু মিলিয়ে গণতান্ত্রিক কাঠামো আজ প্রশ্নের মুখে। এই প্রেক্ষাপটে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং তার নেতৃত্বের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বর্তমানে প্রবাসে অবস্থান করলেও বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আলোচনায় তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত হয়েছেন।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান মূলত নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র, সাংবিধানিক অধিকার এবং জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে নির্দলীয় ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার আহ্বান। এসব বক্তব্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতি একটি সুস্পষ্ট অবস্থান হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
প্রবাস থেকে দল পরিচালনা করলেও তারেক রহমান বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বজায় রেখেছেন। দলীয় কর্মসূচি নির্ধারণ, আন্দোলনের কৌশল ঠিক করা এবং রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছেন। ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে নিয়মিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা তার নেতৃত্বের একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও প্রবাসে অবস্থান করা তার জন্য বাস্তব রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে, তবুও এতে তার রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি স্তিমিত হয়নি—এটাই বর্তমান বাস্তবতা।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে তারেক রহমানের কৌশলের একটি বড় দিক হলো রাজনৈতিক ঐক্যের আহ্বান। তিনি বিভিন্ন সময়ে সরকারবিরোধী দল ও শক্তিগুলোকে একটি অভিন্ন দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথা বলেছেন। রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি ন্যূনতম গণতান্ত্রিক ঐকমত্য গড়ে তোলার আহ্বান তার বক্তব্যে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। তবে এই ঐক্য বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
তারেক রহমানের বক্তব্যে রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনের পেশাদারিত্ব এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—এসব বিষয়ে তিনি সংস্কারমূলক দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেছেন। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়, বরং একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল—এই ধারণা তার রাজনৈতিক ভাষণে স্পষ্ট। এটি বিএনপির প্রচলিত আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে একটি নীতিনির্ভর অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
তবে তারেক রহমানের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনাও কম নয়। রাজনৈতিক মামলাগুলো, অতীতের বিতর্ক এবং নেতৃত্বের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন এখনো রাজনৈতিক আলোচনার অংশ। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য এসব প্রশ্নের মোকাবিলা করাও তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকের মতে, শুধু সরকারের সমালোচনা নয়, বরং নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য জরুরি।
এছাড়া রাজপথের আন্দোলন বনাম নির্বাচনমুখী রাজনীতি—এই দ্বৈত কৌশলের বিষয়টিও তারেক রহমানের নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কখনো কঠোর আন্দোলনের ডাক, আবার কখনো নির্বাচনের প্রস্তুতির বার্তা—এই কৌশল বিএনপির জন্য কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য আন্দোলন প্রয়োজন, কিন্তু সেই আন্দোলনকে জনগণের প্রত্যাশা ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণ সমাজের প্রতি তারেক রহমানের বার্তা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আলোচনায় আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা—এই বিষয়গুলো তরুণদের রাজনীতিতে আগ্রহী করতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে তরুণদের আস্থা অর্জনের জন্য কেবল বক্তব্য নয়, একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখা ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন—যা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে তারেক রহমানের ভূমিকা তাই একমাত্রিক নয়। তিনি একদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির প্রধান মুখ, অন্যদিকে তার নেতৃত্ব নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ও প্রশ্নের মুখোমুখি। তার বক্তব্য, কৌশল ও রাজনৈতিক অবস্থান গণতন্ত্রের পক্ষে একটি চাপ সৃষ্টি করছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এই চাপ কতটা টেকসই ও ফলপ্রসূ হবে, তা নির্ভর করবে তার নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বাস্তব রাজনৈতিক সক্ষমতার ওপর।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার কোনো একক ব্যক্তি বা দলের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে সরকার, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান—সবার ভূমিকা জরুরি। এই প্রক্রিয়ায় তারেক রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু চূড়ান্ত নির্ধারক নন। সময়ই বলবে, তার রাজনৈতিক অবস্থান ও কৌশল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
আকাশজমিন / আরআর