জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কবি নজরুল ইসলামের গানের নামে নির্মিত ‘অঞ্জলি লহ মোর’ ভাস্কর্যটি ভাঙার আট মাস পার হলেও এখনো সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়নি। দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে শিক্ষক–শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক মহলে বাড়ছে হতাশা ও অসন্তোষ।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে নজরুলের একটি গানের ভাবনা অবলম্বনে ‘অঞ্জলি লহ মোর’ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়। নির্মাণের এক বছরের মধ্যেই, ২০২৫ সালের ১৭ জুন ঈদুল আজহার ছুটিকালীন সময়ে কোনো পূর্বঘোষণা বা সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই ভাস্কর্যটি ভাঙার কাজ শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ছুটির সুযোগে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াকে শুরু থেকেই অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত বলে আখ্যা দেন অনেকে।
ভাস্কর্য ভাঙার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এবং গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়। শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী ও নজরুলপ্রেমীদের প্রতিবাদের মুখে প্রশাসন ভাঙার কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এ সময় ভাস্কর্য ভাঙার বিষয়ে কোনো পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত ছিল না বলে দাবি করে প্রকল্প পরিচালক, উপাচার্য ও ট্রেজারার একে অপরের ওপর দায় চাপান।
পরিস্থিতি সামাল দিতে চার দিন পর, ২২ জুন অনুষ্ঠিত এক জরুরি সভায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, সংস্কারের উদ্দেশ্যেই ভাস্কর্য ভাঙার কাজ শুরু করা হয়েছিল। একই সভায় ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। তবে কমিটি গঠনের প্রায় আট মাস পেরিয়ে গেলেও সংস্কার কার্যক্রমে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিকল্পিত নকশা ও ডিজাইনের অভাবে সংস্কার কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে এত দীর্ঘ সময়েও কার্যকর কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ না করায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অভিজিৎ কর্মকার বলেন, “পূর্বনির্ধারিত কোনো সিদ্ধান্ত না থাকলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কীভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী একটি স্থাপনা ভাঙতে পারে, সেটাই বড় প্রশ্ন। যখন একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অদৃশ্য শক্তির কাছে মাথা নত করে, তখন সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে।”
সরেজমিনে দেখা যায়, ভাস্কর্যটির হাতের কব্জি থেকে আঙুল পর্যন্ত অংশ ভেঙে গেছে এবং ভেতরের লোহার রডের সঙ্গে ঝুলে রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভাস্কর্যটির নির্মাতা মনিন্দ্র পাল বলেন, নজরুলের একটি গানের ভাবনাকে কেন্দ্র করেই শিল্পকর্মটি নির্মাণ করা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বা বিতর্কিত উদ্দেশ্যের সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তার মতে, সংস্কারের প্রকৃত ইচ্ছা থাকলে এতদিনে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হতো।
ভাস্কর্য সংস্কারের অগ্রগতি প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার ও সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী বলেন, ভাস্কর্যটির ডেভেলপমেন্ট ও আর্থিক বিষয় জটিল। পূর্বের কাজসংক্রান্ত ডকুমেন্টেশনের ঘাটতির কারণে বিষয়টি সময় নিচ্ছে।
আট মাস পেরিয়ে গেলেও সংস্কার কাজ শুরু না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।