ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাপানে ঘরজামাই দত্তক নিচ্ছে ধনী পরিবার, সুযোগ বাংলাদেশিদেরও


  • আপলোড সময় : রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ৩:৩৩ পিএম

শৌখিনতা কিংবা নিছক পারিবারিক অনুগত্য নয়, বরং শতবর্ষী পারিবারিক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এবং বংশের ধারা অক্ষুণ্ণ রাখতে জাপানে প্রচলিত রয়েছে এক অদ্ভুত ও ব্যতিক্রমী ঐতিহ্য। এই প্রাচীন প্রথার নাম ‘মুকোয়োশি’, যার সহজ অর্থ দাঁড়ায় ‘দত্তক ঘরজামাই’। জাপানি সমাজে কেবল শিশু নয়, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের আইনগতভাবে দত্তক নেওয়ার এই রীতি শতাব্দী ধরে চলে আসছে। দেশটির বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাপানে মোট দত্তক নেওয়ার ঘটনার ৯০ শতাংশের বেশি ঘটে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে, যাদের অধিকাংশই বিশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সী তরুণ। মূলত বংশের পদবি এবং পারিবারিক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতেই এই বিশেষ সামাজিক ও আইনি ব্যবস্থার আশ্রয় নেওয়া হয়।


জাপানি সংস্কৃতিতে পারিবারিক ব্যবসার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ। বহু প্রতিষ্ঠান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই পরিবারের হাতে পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে কোনো পরিবারে যদি পুত্রসন্তান না থাকে কিংবা বিদ্যমান সন্তানেরা যদি ব্যবসা পরিচালনায় অপারগ বা অনিচ্ছুক হন, তবে ঐতিহ্য হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়। এই সংকট মোকাবিলা করার জন্যই জাপানি পরিবারগুলো একজন যোগ্য ও দক্ষ তরুণকে দত্তক নেওয়ার পথ বেছে নেয়। আর সেই তরুণ যদি পরিবারের মেয়ের স্বামী হন, তবে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও সহজ ও ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে। বিয়ের পর ওই যুবক শ্বশুরবাড়ির পদবি গ্রহণ করেন এবং ধীরে ধীরে পারিবারিক ব্যবসা, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন।


এর ফলে জামাই কেবল জামাই হিসেবেই থাকেন না, বরং তিনি হয়ে ওঠেন পরিবারের মূল উত্তরসূরি এবং কুলপ্রদীপের বাহক। জাপানের বিখ্যাত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পেছনের ইতিহাস ঘাঁটলে এই প্রথার সুদূর প্রসারী প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্বখ্যাত সুজুকি মোটর করপোরেশনের নেতৃত্বে বহুবার দত্তক পুত্র বা ঘরজামাইয়ের সফল আগমন ঘটেছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘকালীন প্রধান ওসামু সুজুকিও এই ঐতিহাসিক প্রথার মাধ্যমেই পরিবারে প্রবেশ করেছিলেন। এছাড়া নিনটেনডো, কিক্কোমান ও টয়োটার মতো বৈশ্বিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও এই ধরনের উত্তরাধিকার ব্যবস্থার গভীর যোগসূত্র রয়েছে। ফলে জাপানের অর্থনৈতিক ইতিহাসে মুকোয়োশি প্রথা কেবল একটি সামাজিক আচার নয়, বরং করপোরেট সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার এক পরীক্ষিত কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।


আইনি প্রক্রিয়ার দিক থেকে এই দত্তক প্রথা জাপানের সরকারি পারিবারিক নথি ‘কোসেকি’-তে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে নিবন্ধিত হয়। দত্তক গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জন্মসূত্রে পাওয়া নিজের পদবি পরিবর্তন করে নতুন পরিবারের পদবি গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি জন্মসন্তানের সমতুল্য আইনি অধিকার, সম্পত্তির অংশ এবং পারিবারিক দায়িত্ব লাভ করেন। তবে এর পাশাপাশি বড় ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্বও তার কাঁধে এসে বর্তায়। বিশেষ করে পরিবারের বয়োবৃদ্ধ সদস্যদের সেবাযত্ন করা এবং বংশের মানমর্যাদা রক্ষা করার মূল দায়িত্ব তখন এই দত্তক পুত্রের ওপরই ন্যস্ত হয়।


সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই অনন্য সুযোগের পরিসর কেবল স্থানীয় নাগরিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিয়ম অনুযায়ী, জাপানে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের বৈধ অনুমতি বা ভিসা থাকা বিদেশি নাগরিকরাও নির্দিষ্ট কিছু কঠোর শর্ত পূরণ সাপেক্ষে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দত্তক হতে পারেন। কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে এর জন্য আদালতের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনেরও প্রয়োজন হয়। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক যদি জাপানের আইনি ও সামাজিক শর্তগুলো সফলভাবে পূরণ করতে পারেন, তবে তিনিও জাপানি পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক দত্তক সন্তান বা মুকোয়োশি হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারেন। তবে এটি পরিষ্কার করা জরুরি যে, কেবল দত্তক হওয়ার মাধ্যমেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাপানের নাগরিকত্ব কিংবা স্থায়ী বসবাসের ছাড়পত্র পান না; এর জন্য দেশটির প্রচলিত অভিবাসন আইন ও স্বতন্ত্র আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।


আধুনিক যুগে এসে জাপানের জন্মহার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাওয়ার কারণে এই প্রাচীন প্রথার গুরুত্ব নতুন মাত্রা লাভ করেছে। বহু শিল্পপতির ঘরে সন্তান থাকলেও পুরুষ উত্তরাধিকারীর অভাব কিংবা উপযুক্ত নেতৃত্বের সংকটের কারণে শতবর্ষী ব্যবসা হুমকির মুখে পড়ছে। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে পুত্রসন্তানের জন্য অপেক্ষা না করে যোগ্য কোনো ঘরজামাইকে বেছে নেওয়ার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি জাপানে উপযুক্ত এবং দক্ষ প্রার্থী খুঁজে দেওয়ার জন্য বিশেষ পেশাদার ম্যাচমেকিং সেবাও চালু রয়েছে।


এ নিয়ে জাপানি সমাজে একটি বহুল প্রচলিত জনপ্রিয় প্রবাদ রয়েছে—‘তুমি নিজের পুত্রসন্তান নিজে বেছে নিতে পারো না, কিন্তু নিজের জামাইকে পছন্দ করে বেছে নিতে পারো।’ তবে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক প্রেক্ষাপটে এই প্রথা নিয়ে নানান আলোচনা ও সমালোচনাও শুরু হয়েছে। বর্তমান জাপানে নারীরা রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে করপোরেট জগতের উচ্চপদ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে অত্যন্ত সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন। ফলে কেবল পুরুষ উত্তরাধিকারী বা পুত্রসন্তানের ওপর নির্ভর করার পুরোনো মানসিকতা কতটা প্রাসঙ্গিক, তা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা নতুন করে ভাবছেন। তা সত্ত্বেও শত বছরের পুরনো ঐতিহ্য, পারিবারিক ব্যবসার ধারাবাহিকতা এবং সম্পদ রক্ষায় মুকোয়োশি প্রথার আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। কারো কাছে এটি স্রেফ একটি পারিবারিক নাটক বা ঘরজামাইয়ের গল্প হলেও, জাপানিদের কাছে এটি তাদের ঐতিহ্যবাহী অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার এক সুচারু ও ঐতিহাসিক চালিকাশক্তি।


এ সম্পর্কিত আরো খবর