পড়ন্ত মৌসুমে প্রকৃতির এক ভয়ংকর ও নিষ্ঠুর রূপ দেখল ভারতের উত্তর প্রদেশ। গত তিন দিন ধরে অবিরাম ও মুষলধারে চলা ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে ভারতের অন্যতম জনবহুল এই রাজ্যে নেমে এসেছে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। আকস্মিক বন্যা, তীব্র পাহাড়ি ঢল এবং প্রলয়ংকরী ভূমিধসের করাল গ্রাসে এ পর্যন্ত অন্তত ৫৬ জন মানুষের প্রাণহানির মর্মান্তিক সংবাদ পাওয়া গেছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে এমন নজিরবিহীন ও আকস্মিক প্রাকৃতিক তাণ্ডবে পুরো রাজ্যজুড়ে গভীর শোক, আতঙ্ক ও চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) উত্তর প্রদেশ রাজ্য সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা এবং ত্রাণ কমিশনারের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে হতাহতের এই মর্মান্তিক পরিসংখ্যান নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এই রাজ্যে প্রায় ২৪ কোটিরও বেশি মানুষ বসবাস করেন। সাধারণত প্রতি বছর জুন মাস থেকে শুরু করে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত স্থায়ী বর্ষা ঋতুতে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং হালকা কালবৈশাখীর দেখা মিললেও এবারের প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও উগ্র রূপ ধারণ করেছে।
ত্রাণ কমিশনারের কার্যালয় থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতির বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, উত্তর প্রদেশের বিস্তীর্ণ জনপদজুড়ে অতিভারী বর্ষণের কারণে সৃষ্ট প্রলয়ংকরী বন্যা ও মারাত্মক ভূমিধসের ঘটনায় ৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এই আকস্মিক দুর্যোগে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও বহু সাধারণ মানুষ, যাদের অনেকেই বিভিন্ন স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আবহাওয়াবিদদের মতে, বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া একটি শক্তিশালী নিম্নচাপ সরাসরি স্থলভাগে প্রবেশ করার কারণে পুরো অঞ্চলজুড়ে আবহাওয়ার পরিস্থিতি অত্যন্ত প্রতিকূল হয়ে ওঠে এবং বৃষ্টির তীব্রতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এই প্রাকৃতিক তাণ্ডবের ফলে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এক হাজারের অধিক বসতবাড়ি সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে ধসে পড়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।
ভারতের জাতীয় আবহাওয়া অফিস ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বিগত বেশ কিছুদিন ধরে তীব্র বজ্রঝড়, ঘন ঘন বজ্রপাত এবং চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি বৃদ্ধির বিষয়ে বারবার সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে আসছেন। বৈশ্বিক তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবের ফলশ্রুতিতেই যে এ ধরনের অস্বাভাবিক বিপর্যয় ঘন ঘন ঘটছে, সে বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আবহাওয়ার এই চরম পরিবর্তনের এক ভীতিকর চিত্র উঠে এসেছে। গত শুক্রবার থেকে শুরু করে রবিবারের মধ্যে উত্তর প্রদেশ রাজ্যে গড়ে ৬৬ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অথচ বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে অঞ্চলটিতে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের গড় মাত্রা থাকে মাত্র ৭ দশমিক ৬ মিলিমিটার। অর্থাৎ, স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় নয় গুণেরও বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে রাজ্যের নদনদীগুলোর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং বহু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
দুর্যোগ কবলিত অঞ্চলগুলোতে বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ বিতরণ এবং উদ্ধারকাজ পরিচালনা করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী মাঠে নেমেছে। তবে বৈরী আবহাওয়া ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অবনতির কারণে অনেক দুর্গম এলাকাগুলোতে তাৎক্ষণিকভাবে সাহায্য পৌঁছাতে উদ্ধারকর্মীদের মারাত্মক বেগ পেতে হচ্ছে। ঘরছাড়া ও পানিবন্দী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলা করতে না পারলে আগামী দিনে এই অঞ্চলের মানুষ আরও বড় ধরনের প্রাকৃতিক সংকটের মুখে পড়তে পারে।
সূত্র: এএফপি